পঞ্চম অধ্যায়: ইসরা ও মিরাজ (এক মহাজাগতিক পরিভ্রমণ ও ঐশ্বরিক সান্নিধ্য)
‘দুঃখের বছর’ এবং তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বাহ্যিকভাবে প্রায় আশ্রয়হীন এবং মানসিকভাবে গভীর শোকাহত, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে এমন এক সম্মান, সান্ত্বনা ও মর্যাদা দান করলেন, যা মানব ইতিহাসের সকল প্রজ্ঞা ও কল্পনার ঊর্ধ্বে।
এই অলৌকিক ঘটনাটি দুটি পর্বে বিভক্ত: ইসরা (মক্কা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত রাত্রিকালীন ভ্রমণ) এবং মিরাজ (ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ ও ঐশ্বরিক সান্নিধ্য)।
এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নবীর জন্য এক বিশেষ নিমন্ত্রণ, যা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানই বৃদ্ধি করেনি, বরং ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছে।
৫.১ ইসরা: দুই কিবলার সংযোগ ও নবুয়তের বিশ্বজনীন স্বীকৃতি
নবুয়তের দশম বা একাদশ বছরে, রজব মাসের এক রাতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবা শরীফের হাতিমে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় হজরত জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) আগমন করেন এবং তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে তা জমজমের পবিত্র পানি দিয়ে ধুয়ে ঈমান ও হিকমত (প্রজ্ঞা) দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন।
এটি ছিল সেই মহিমান্বিত সফরের জন্য তাঁর আত্মাকে প্রস্তুত করার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। এরপর তাঁর সামনে ‘বোরাক’ নামক এক বিশেষ বাহন উপস্থিত করা হয়।
হাদিসের বর্ণনানুযায়ী, বোরাক ছিল সাদা রঙের, খচ্চরের চেয়ে ছোট কিন্তু গাধার চেয়ে বড় এক প্রাণী, যার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল দৃষ্টির শেষ সীমানায়।⁴¹
ঐতিহাসিক রাত্রিকালীন ভ্রমণ:
জিবরাইল (আ.)-এর সাথে বোরাকে আরোহণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত এক অবিশ্বাস্য রাত্রিকালীন ভ্রমণ সম্পন্ন করেন, যা পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
এই যাত্রা শুধু একটি ভৌগোলিক পরিভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল ইতিহাসের এক সেতুবন্ধন। এই যাত্রাপথে জিবরাইল (আ.) তাঁকে ইয়াসরিব (মদিনা), তুর পাহাড় (সিনাই পর্বত) এবং বাইতে লাহাম (বেথেলহেম) এর মতো ঐতিহাসিক স্থানে থামিয়ে দুই রাকাত করে সালাত আদায় করান।⁴²
বিশ্লেষণ:
এই স্থানগুলোতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাঁর মিশনকে পূর্ববর্তী নবী, বিশেষ করে মুসা (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর মিশনের ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ইমামুল মুরসালিন: সকল নবীর ইমামতি:
মসজিদুল আকসায় পৌঁছে তিনি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে পান। মানব ইতিহাসের সকল নবী ও রাসুল (আ.) সেখানে একত্রিত হয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
জিবরাইল (আ.) তাঁকে সামনে এগিয়ে দেন এবং তিনি সকল নবীর ইমাম হিসেবে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন।⁴³
বিশ্লেষণ:
এই ঘটনাটি ছিল এক গভীর প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, এটি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দুই পুত্র ইসমাইল (আ.) ও ইসহাক (আ.)-এর নবুয়তের ধারাকে একত্রিত করে।
দ্বিতীয়ত, সকল নবীর ইমামতি করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সা.)-কে ‘ইমামুল মুরসালিন’ (সকল রাসুলের নেতা) এবং ‘সাইয়্যিদুল আম্বিয়া’ (সকল নবীর সরদার) হিসেবে আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত স্বীকৃতি প্রদান করেন।
এটি ঘোষণা করে যে, তাঁর আনীত ধর্ম ইসলাম পূর্ববর্তী সকল আসমানি ধর্মের পূর্ণতাদানকারী এবং তিনিই হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী।
৫.২ মিরাজ: ঊর্ধ্বাকাশের রহস্য উন্মোচন
মসজিদুল আকসা থেকে মিরাজ বা ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণের জন্য এক বিশেষ সিঁড়ি বা সোপান নিয়ে আসা হয়। সেই সোপানে চড়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.)-এর সাথে ঊর্ধ্বাকাশের পথে যাত্রা করেন।
সপ্তাকাশের দ্বার উন্মোচন ও নবীদের সাথে সাক্ষাৎ:
প্রতিটি আসমানের দ্বারে পৌঁছানোর পর জিবরাইল (আ.) ও আসমানের প্রহরীর মধ্যে এক অর্থবহ কথোপকথন হয়, যা এই সফরের আনুষ্ঠানিকতা ও গুরুত্বকে তুলে ধরে।
এরপরই আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। প্রতিটি আসমানে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁরা তাঁকে “হে পুণ্যবান ভাই ও পুণ্যবান নবী” বলে স্বাগত জানান।⁴⁴
৫.৩ মহাজাগতিক দর্শন: জান্নাত, জাহান্নাম ও সিদরাতুল মুনতাহা
মিরাজের সফর শুধু নবীদের সাথে সাক্ষাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল মহাবিশ্বের অপার রহস্য এবং পরকালের বাস্তব চিত্র স্বচক্ষে দেখার এক অনন্য সুযোগ।
জাহান্নাম ও জান্নাতের দৃশ্য দর্শন:
ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জাহান্নাম ও জান্নাতের কিছু দৃশ্য দেখানো হয়। তিনি সুদখোর, গীবতকারী, ব্যভিচারী এবং কথায় ও কাজে অমিল থাকা বক্তাদের ভয়াবহ পরিণতি দেখতে পান।
অন্যদিকে, তিনি জান্নাতের এমন সব নিয়ামত প্রত্যক্ষ করেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি ‘আল-কাওসার’ নামক নহর দর্শন করেন, যা আল্লাহ তাঁকে বিশেষভাবে দান করেছেন।⁴⁵
বিশ্লেষণ:
এই দৃশ্যগুলো কোনো ভয় দেখানো বা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ছিল না। বরং এটি ছিল পাপের বাস্তব ও ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মানবজাতিকে সুস্পষ্টভাবে সাবধান করার জন্য, যেন তারা এসব ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে।
সিদরাতুল মুনতাহা ও জিবরাইল (আ.)-এর সীমানা:
সপ্তম আসমানের পর তিনি ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক এক প্রকাণ্ড কুল বৃক্ষের কাছে পৌঁছান। এটিই সৃষ্টির জ্ঞানের শেষ সীমানা। হাদিসের বর্ণনানুযায়ী, সেই বৃক্ষের পাতা ছিল হাতির কানের মতো এবং ফল ছিল বিশাল মটকার মতো।
এটিকে বিভিন্ন ঐশ্বরিক রঙ এমনভাবে আবৃত করে রেখেছিল যে তার সৌন্দর্য বর্ণনা করা অসম্ভব। এখানেই জিবরাইল (আ.) থেমে যান এবং বলেন,
বিশ্লেষণ:
এই কথোপকথনটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় মর্যাদা প্রকাশ করে। সৃষ্টির সবচেয়ে সম্মানিত ফেরেশতার যেখানে গমন করার অনুমতি নেই, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে সেই সীমানার ঊর্ধ্বে তাঁর সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছিলেন।
৫.৪ ঐশ্বরিক সান্নিধ্য ও শ্রেষ্ঠ উপহার: আস-সালাত
সিদরাতুল মুনতাহার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) একাকী আল্লাহর আরশের দিকে অগ্রসর হন এবং মহান রব্বুল আলামিনের এত নিকটবর্তী হন, যা মানুষের কল্পনার অতীত। এখানেই তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেন।
এই মহিমান্বিত সাক্ষাতের সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দেন।
ফেরার পথে ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.)-এর সাথে আবার দেখা হলে তিনি রাসুল (সা.)-কে এই বিধান সহজ করার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন করতে বলেন। মুসা (আ.) নিজ জাতির অভিজ্ঞতা থেকে জানতেন যে, উম্মতের জন্য এই বিধান পালন করা অত্যন্ত কষ্টকর হবে।
উম্মতের প্রতি অসীম ভালোবাসার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বারবার আল্লাহর কাছে ফিরে যান এবং সালাতের সংখ্যা কমাতে থাকেন, যতক্ষণ না তা পাঁচ ওয়াক্তে এসে দাঁড়ায়। তখন আল্লাহ বলেন,
৫.৫ প্রত্যাবর্তন ও ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা
একই রাতের মধ্যে এই মহাজাগতিক সফর শেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় ফিরে আসেন। পরদিন সকালে যখন তিনি এই ঘটনার কথা প্রকাশ করেন, তখন মক্কায় অবিশ্বাস ও উপহাসের ঝড় ওঠে।
অবিশ্বাস ও উপহাস:
কুরাইশ কাফিররা এটিকে রাসুল (সা.)-কে মিথ্যাবাদী প্রমাণের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের গঠন ও খুঁটিনাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকে।
তখন আল্লাহ তাআলা বায়তুল মুকাদ্দাসকে তাঁর চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তিনি দেখে দেখে তাদের সকল প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর দেন।⁴⁸
আবু বকরের ঈমান ও ‘সিদ্দিক’ উপাধি:
দুর্বল ঈমানের কিছু মুসলিমও যখন এই ঘটনায় সন্দিহান হয়ে পড়ে, তখন হজরত আবু বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ঘোষণা দেন:
অদৃশ্যের প্রতি এই নিঃশর্ত ও অটল বিশ্বাসের কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সেই দিন ‘আস-সিদ্দিক’ (পরম সত্যনিষ্ঠ) উপাধিতে ভূষিত করেন।⁴⁹
বিশ্লেষণ:
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা ছিল ঈমানের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা, যা সত্যনিষ্ঠ ও সন্দিহানদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে ঈমান শুধু যুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং রাসুলের কথার ওপর নিঃশর্ত আস্থার নামই ঈমান।
এই ঘটনা মুসলিমদের আধ্যাত্মিক মনোবলকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং এটি ছিল হিজরতের পূর্বে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
তথ্যসূত্র: পঞ্চম অধ্যায়: ইসরা ও মিরাজ
⁴¹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৩৪।
⁴² আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস, সুনানে নাসায়ী। আর-রাহিকুল মাখতুম–এ এই স্থানগুলোতে সালাত আদায়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, পৃ. ১৩৫।
⁴³ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২; ইবনে কাসির, তাফসির আল-কুরআন আল-আযিম (সূরা বনি ইসরাইলের তাফসির)।
⁴⁴ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩২৩১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৩। প্রতিটি আসমানে সাক্ষাতকৃত নবীদের বিস্তারিত বিবরণ হাদিস গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।
⁴⁵ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৭৫১৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮২২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৩৮।
⁴⁶ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২; আল-কুরআন, সূরা আন-নাজম, ৫৩:১৩-১৮।
⁴⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৭৫১৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২।
⁴⁸ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৬; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৪১।
⁴⁹ মুসতাদরাকে হাকিম, ৩/৬২; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪০১-৪০২।