মদিনায় হিজরত

সপ্তম অধ্যায়: মদিনায় হিজরত (ত্যাগ ও বিজয়ের পথে যাত্রা)

সপ্তম অধ্যায়: মদিনায় হিজরত (ত্যাগ ও বিজয়ের পথে যাত্রা)

আকাবার দ্বিতীয় শপথে মদিনায় একটি নিরাপদ আবাসভূমি নিশ্চিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার নির্যাতিত মুসলিমদের মদিনায় হিজরতের অনুমতি দেন। ঈমানের টানে সাহাবীরা তাঁদের প্রিয় জন্মভূমি, ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ ত্যাগ করে মদিনার পথে যাত্রা শুরু করেন।

মক্কা ধীরে ধীরে মুমিনদের উপস্থিতিতে প্রায় শূন্য হয়ে পড়ছিল, যা কুরাইশদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও হতাশার সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারছিল, মুহাম্মদ (সা.) যদি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মদিনায় একটি শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তবে তা তাদের ক্ষমতা, বাণিজ্য এবং পৌত্তলিক ধর্মের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই আতঙ্ক থেকেই তারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে।

৭.১ দারুন নাদওয়ার ষড়যন্ত্র: হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা

মুসলিমদের সফল হিজরতে দিশেহারা হয়ে কুরাইশ নেতারা তাদের মন্ত্রণাসভা ‘দারুন নাদওয়া’-এ এক জরুরি বৈঠকে বসে। এই বৈঠকে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ কুরাইশের সকল প্রভাবশালী নেতারা উপস্থিত ছিল। এমনকি ইবলিস শয়তানও নজদের এক বৃদ্ধের ছদ্মবেশে এই বৈঠকে যোগ দেয় বলে ইতিহাসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কীভাবে প্রতিহত করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে থাকে।

অবশেষে, আবু জাহেল সবচেয়ে নৃশংস প্রস্তাবটি দেয়: প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবককে নির্বাচন করতে হবে, যারা সবাই মিলে একসাথে মুহাম্মদের ওপর আক্রমণ করে তাকে হত্যা করবে।

এভাবে তাঁর রক্তের দায় সকল গোত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে এবং বনু হাশিম গোত্র একাকী সকল গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাবে না। এই ঘৃণ্য প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং সেই রাতেই তা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।⁵⁸

৭.২ ঐশ্বরিক সুরক্ষা ও নবীর কৌশল

কিন্তু কুরাইশদের সকল ষড়যন্ত্রের ঊর্ধ্বে ছিল আল্লাহর পরিকল্পনা। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর প্রিয় নবীকে এই হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন এবং তাঁকে হিজরতের চূড়ান্ত অনুমতি প্রদান করেন।

আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক নিখুঁত ও অত্যন্ত সতর্ক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যা তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার প্রমাণ দেয়:

আলি (রা.)-এর আত্মত্যাগ:

তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হজরত আলি (রা.)-কে তাঁর বিছানায় তাঁর সবুজ চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে বলেন। এর দুটি উদ্দেশ্য ছিল: প্রথমত, শত্রুরা যেন মনে করে তিনি ঘরেই ঘুমিয়ে আছেন, যা তাঁকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সময় দেবে।

দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর কাছে কুরাইশ শত্রুদের যে সমস্ত আমানত গচ্ছিত ছিল, সেগুলো পরদিন সকালে তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি আলি (রা.)-কে অর্পণ করেন। চরম বিপদের মুহূর্তেও আমানত রক্ষার এই দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসে বিরল।

গোপন প্রস্থান:

রাতের গভীরে, যখন ঘাতক যুবকেরা তাঁর বাড়ি ঘিরে রেখেছিল, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সূরা ইয়াসিনের প্রথম কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে তাদের সামনে দিয়েই বেরিয়ে যান। আল্লাহ তাদের চোখের ওপর পর্দা ফেলে দিয়েছিলেন, তাই তারা কেউই তাঁকে দেখতে পায়নি।⁵⁹

৭.৩ সাওর পর্বতের গুহায় তিন দিন: আস্থা ও প্রশান্তির মুহূর্ত

রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি মদিনার উত্তর দিকের পথে না গিয়ে, সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সাওর পর্বতের দিকে যাত্রা করেন। তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। এটি ছিল শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার একটি অসাধারণ সামরিক কৌশল।

গুহার ভেতরের প্রস্তুতি:

সাওর পর্বতের চূড়ায় একটি দুর্গম গুহায় তাঁরা আশ্রয় নেন। আবু বকর (রা.) প্রথমে গুহার ভেতরে প্রবেশ করে তা পরিষ্কার করেন এবং কাপড়ের টুকরো দিয়ে সম্ভাব্য সকল গর্ত বন্ধ করে দেন, যেন কোনো বিষাক্ত প্রাণী রাসুল (সা.)-এর ক্ষতি করতে না পারে।

আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা:

তাঁরা তিন দিন পর্যন্ত সেই গুহায় লুকিয়ে ছিলেন। এই সময় কুরাইশরা তাঁদের খোঁজে চারদিকে উন্মাদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছিল। এক পর্যায়ে তারা গুহার একেবারে মুখের কাছে এসে পড়ে। গুহার ভেতর থেকে তাদের পা দেখা যাচ্ছিল। হজরত আবু বকর (রা.) ভীত ও উদ্বিগ্ন হয়ে ফিসফিস করে বলেন,

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) যে প্রশান্তিপূর্ণ ও ঈমানদীপ্ত উত্তর দিয়েছিলেন, তা পবিত্র কুরআনে অমর হয়ে আছে:

তাঁর এই কথা আবু বকর (রা.)-এর হৃদয়কে প্রশান্তিতে ভরে দেয়।

ঐশ্বরিক সাহায্য ও নিখুঁত পরিকল্পনা:

আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে তাঁদের রক্ষা করেন। গুহার মুখে একটি মাকড়সা দ্রুত একটি নিখুঁত জাল বুনে দেয় এবং একজোড়া কবুতর সেখানে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। শত্রুরা গুহার মুখে এই দৃশ্য দেখে নিশ্চিত হয় যে, এর ভেতরে সম্প্রতি কেউ প্রবেশ করেনি।⁶¹

এই তিন দিন হজরত আবু বকর (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ রাতের আঁধারে গুহায় এসে কুরাইশদের সকল পরিকল্পনা ও সংবাদ পৌঁছে দিতেন।

তাঁর কন্যা আসমা (রা.) প্রতিদিন গোপনে খাবার ও পানীয় নিয়ে আসতেন। তাঁর গোলাম আমির ইবনে ফুহাইরা ছাগলের পাল চড়িয়ে তাঁদের পায়ের ছাপ মুছে দিতেন। এই পুরো অভিযানটি ছিল এক অত্যন্ত সুসংগঠিত ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফসল।⁶²

৭.৪ ধাওয়াকারী সুরাকা ও এক অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী

তিন দিন পর, যখন অনুসন্ধান কিছুটা শিথিল হলো, তখন তাঁরা একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক, আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের (যিনি তখনো মুসলিম হননি) সাথে মদিনার দিকে এক অপরিচিত ও দুর্গম পথ ধরে যাত্রা শুরু করেন।

কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.)-কে জীবিত বা মৃত ধরে দেওয়ার জন্য একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এই পুরস্কারের লোভে সুরাকা ইবনে মালিক নামক এক অশ্বারোহী তাঁদের পিছু নেয়। যখন সে প্রায় তাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন তার ঘোড়ার পা তিনবার মাটিতে দেবে যায়।

তৃতীয়বার যখন এটি ঘটে, তখন সে বুঝতে পারে যে এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয় এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর দ্বারা সুরক্ষিত। সে তখন ক্ষমা চায় এবং নিরাপত্তা চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ক্ষমা করে দেন এবং একটি চামড়ার ওপর তার জন্য একটি নিরাপত্তা-পত্র লিখে দেন।

তখন রাসুল (সা.) তাকে উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন:

সুরাকা তখন হতবাক হয়ে যায়। বহু বছর পর, হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে যখন পারস্য বিজয় হয় এবং কিসরার রাজমুকুট ও কঙ্কণ মদিনায় নিয়ে আসা হয়, তখন ওমর (রা.) সুরাকাকে ডেকে এনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করেন।⁶³

৭.৫ কুবা পল্লীতে প্রথম অবতরণ ও মদিনায় ঐতিহাসিক প্রবেশ

দীর্ঘ ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অবশেষে মদিনার উপকণ্ঠে কুবা নামক স্থানে পৌঁছান। সেখানে তিনি চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন এবং ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ, মসজিদে কুবা, নির্মাণ করেন, যার ভিত্তি তিনি নিজ হাতে স্থাপন করেছিলেন।⁶⁴

এরপর তিনি মদিনার মূল শহরের দিকে যাত্রা করেন। মদিনাবাসীরা, বিশেষ করে আনসাররা, অধীর আগ্রহে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর আগমনের সংবাদে মদিনায় এক অভূতপূর্ব আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে

নামক বিখ্যাত কবিতাটি গেয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়।

এটি ছিল এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত, যা মক্কার দুঃখ, কষ্ট ও নির্যাতনের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করে এবং মদিনায় এক নতুন, বিজয়ী ও গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে।⁶⁵

তথ্যসূত্র: সপ্তম অধ্যায়: মদিনায় হিজরত

  • ⁵⁸ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৮০-৪৮২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৬৫-১৬৬।
  • ⁵⁹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৮৫-৪৮৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৬৯।
  • ⁶⁰ আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৪০; সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৬৫৩।
  • ⁶¹ মুসনাদে আহমাদ, ১/২৫১; বিভিন্ন সিরাত গ্রন্থে এই ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, যদিও এর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে মূল সুরক্ষা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল, তা কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
  • ⁶² ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৯৩-৪৯৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৭০-১৭১।
  • ⁶³ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৯৬; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৯৬-৪৯৮।
  • ⁶⁴ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৯৯-৫০২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৮-১৭৯।
  • ⁶⁵ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৯৩১; *আর-রাহিকুল মাখতুম

Ha-mim Zubaer