নবম অধ্যায়: জিহাদ, আত্মরক্ষা ও ইসলামের প্রতিষ্ঠা
মদিনায় একটি আদর্শিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার পরও মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র ও হুমকির সম্মুখীন ছিল। মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্যিক স্বার্থ, ধর্মীয় আধিপত্য এবং গোত্রীয় অহংকার—সবকিছুই ইসলামের একত্ববাদী বার্তার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় অমানবিক নির্যাতন নীরবে সহ্য করার পর, মদিনায় এসে মুসলমানরা প্রথমবারের মতো আত্মরক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের অনুমতি লাভ করে।
এই অধ্যায়টি সেই অনিবার্য সংঘাতগুলোর প্রেক্ষাপট, ঘটনা এবং সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যকে তুলে ধরবে।
৯.১ ইসলামের জিহাদের অনুমতি ও তার দর্শন
ইসলামে ‘জিহাদ’ একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যার শাব্দিক অর্থ ‘প্রচেষ্টা’ বা ‘সংগ্রাম’। এর একটি পর্যায় হলো, নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এর চূড়ান্ত রূপ হলো ‘ক্বিতাল’ বা সশস্ত্র সংগ্রাম, যা সুনির্দিষ্ট শর্ত ও প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য।
মক্কায় ধৈর্যের কৌশল:
মক্কায় তেরো বছর যাবত মুসলিমদের ওপর আক্রমণ প্রতিহত করার অনুমতি ছিল না। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ প্রশিক্ষণ (‘তারবিয়াহ’), যার উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল মানুষ তৈরি করা, যাদের ভিত্তি হবে ঈমান ও ‘সবর’ (ধৈর্য), আক্রমণাত্মক মনোভাব নয়।
এই কঠিন পরীক্ষা ঈমানের দাবিদারদের থেকে প্রকৃত বিশ্বাসীদের পৃথক করে দিয়েছিল।
ঐশ্বরিক অনুমতি ও তার শর্তাবলি:
হিজরতের পর যখন মুসলিমদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হলো এবং শত্রুদের পক্ষ থেকে আক্রমণের আশঙ্কা বাস্তব হয়ে উঠল, তখন আল্লাহ তাআলা আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেন। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে প্রথম যে আয়াতটি নাজিল হয়, তা হলো:
বিশ্লেষণ:
এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ তাৎপর্যপূর্ণ। “উযিনা” (অনুমতি দেওয়া হলো) শব্দটি প্রমাণ করে এটি কোনো আক্রমণাত্মক নির্দেশ নয়, বরং অত্যাচারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিরক্ষামূলক অনুমতি।
যুদ্ধের কারণ হিসেবে “বিআন্নাহুম যুলিমু” (কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে) উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়াতটির ধারাবাহিকতায় আল্লাহ বলেন, এই যুদ্ধের অনুমতি না দিলে পৃথিবীতে গির্জা, সিনাগগ, মঠ এবং মসজিদসহ সকল উপাসনালয় ধ্বংস হয়ে যেত। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে জিহাদের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সকল ধর্মের উপাসনার স্বাধীনতা রক্ষা করা।⁷¹
৯.২ বদরের যুদ্ধ: সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী দিবস (ইয়াওমুল ফুরকান)
দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ।
প্রেক্ষাপট ও সংঘাত:
কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাগুলো ছিল তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ফিরছিল, যা আটক করার মাধ্যমে কুরাইশদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার একটি কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল।
আবু সুফিয়ান মুসলিমদের আগমনের খবর পেয়ে সাহায্যের জন্য মক্কায় দূত পাঠায় এবং নিজে কাফেলার পথ পরিবর্তন করে নিরাপদে চলে যায়। কিন্তু আবু জাহেলের অহংকার ও যুদ্ধ উন্মাদনার কারণে প্রায় ১,০০০ সুসজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মুসলিমদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য বদর প্রান্তরের দিকে অগ্রসর হয়।⁷²
ঈমান ও নেতৃত্বের পরীক্ষা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র সাহাবীকে নিয়ে কুরাইশদের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হন। তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ (‘শুরা’) করেন। মুহাজির ও আনসার উভয়ই নিঃশর্ত আনুগত্যের ঘোষণা দেন।
যুদ্ধের আগের রাতে তিনি আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে দোয়া করেন, যা তাঁর আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতাকে প্রকাশ করে।⁷³
ঐতিহাসিক বিজয় ও তার তাৎপর্য:
আল্লাহ তাঁর নবীর দোয়া কবুল করেন এবং ফেরেশতা পাঠিয়ে তাঁদের সাহায্য করেন। এই যুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ কুরাইশদের ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দী হয়।⁷⁴
বিশ্লেষণ:
বদরের যুদ্ধ ছিল এক সুস্পষ্ট ঐশ্বরিক নিদর্শন এবং ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ বা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী দিবস। এটি শুধু একটি সামরিক বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল পৌত্তলিকতার মতাদর্শিক পরাজয়।
এই বিজয় মুসলিমদের আরবের এক নতুন ও উদীয়মান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধবন্দীদের সাথে রাসুল (সা.)-এর মানবিক আচরণ—যেমন মুক্তিপণ হিসেবে দশজন মুসলিম শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া—বিশ্বের যুদ্ধ ইতিহাসে এক নতুন নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করে।
৯.৩ ওহুদের যুদ্ধ: আনুগত্য ও শৃঙ্খলার কঠিন পরীক্ষা
বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা কুরাইশরা পরের বছর, তৃতীয় হিজরিতে, ৩,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে।
কৌশলগত ভুল ও বিপর্যয়:
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ভেতর থেকে আত্মরক্ষার পক্ষে থাকলেও, তরুণ সাহাবীদের প্রবল উৎসাহে মদিনার বাইরে ওহুদ প্রান্তরে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার ৩০০ অনুসারী নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে।
রাসুল (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজকে একটি গিরিপথে মোতায়েন করে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন,
যুদ্ধের প্রথমাংশে মুসলমানরা বিজয় লাভ করে এবং কাফিররা পালাতে শুরু করে। তবে তারা অন্যদেরকে গণিমতের মাল সংগ্রহ করতে দেখে অধিকাংশ তীরন্দাজ রাসুল (সা.)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের স্থান ত্যাগ করেন।
কুরাইশ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (তখনো মুসলিম হননি) এই সুযোগে পেছন থেকে গিরিপথ দিয়ে আক্রমণ করে মুসলিম বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।
রাসুল (সা.)-এর দৃঢ়তা ও সাহাবীদের আত্মত্যাগ:
এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রাসুল (সা.) আহত হন, তাঁর দাঁত শহীদ হয় এবং গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধক্ষেত্র অটল থাকেন।
হজরত তালহা (রা.) নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। এই যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর প্রিয় চাচা ও ইসলামের সিংহ হামজা (রা.)-সহ ৭০ জন সাহাবী শহীদ হন।⁷⁶
বিশ্লেষণ:
ওহুদের যুদ্ধ ছিল এক বেদনাদায়ক কিন্তু অপরিহার্য শিক্ষা। এটি মুসলিমদের শিখিয়েছে যে, নেতার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং শৃঙ্খলা হলো বিজয়ের পূর্বশর্ত।
দুনিয়ার প্রতি সামান্য মোহ এবং একটি ভুল সিদ্ধান্ত যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানে এই যুদ্ধের কারণ ও শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
৯.৪ খন্দকের যুদ্ধ (আহযাবের যুদ্ধ): কৌশল, ধৈর্য ও চূড়ান্ত বিজয়
পঞ্চম হিজরিতে আরবের সকল ইসলামবিরোধী শক্তি—মক্কার কুরাইশ, উত্তরের বেদুইন গাতফান গোত্র এবং নির্বাসিত ইহুদি বনু নাজির—একত্রিত হয়ে ‘আহযাব’ (সম্মিলিত বাহিনী) গঠন করে এবং প্রায় ১০,০০০ সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে।⁷⁷
খন্দক খননের অভিনব কৌশল:
মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩,০০০। এই অসম যুদ্ধে পারস্য থেকে আগত সাহাবী সালমান ফারসি (রা.) এক নতুন কৌশল প্রস্তাব করেন—মদিনার উত্তর দিকের অরক্ষিত অংশে পরিখা বা ‘খন্দক’ খনন করা।
আরবরা এই যুদ্ধ কৌশলের সাথে পরিচিত ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অভুক্ত অবস্থায় সাহাবীদের সাথে খন্দক খননে অংশ নেন।⁷⁸
অবরোধ, বিশ্বাসঘাতকতা ও ঐশ্বরিক সাহায্য:
সম্মিলিত বাহিনী খন্দক দেখে হতবাক হয়ে যায় এবং প্রায় এক মাস যাবত মদিনা অবরোধ করে রাখে। এই সময় মদিনার ভেতরের ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুদের সাথে হাত মেলায়, যা মুসলিমদের অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দেয়।⁷⁹
এই সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) নু’আইম ইবনে মাসউদ (রা.)-কে ব্যবহার করে শত্রুদের জোটে বিভেদ সৃষ্টি করেন। অবশেষে, আল্লাহ তাআলা এক প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও ধূলিঝড় পাঠিয়ে শত্রুদের শিবিরকে লন্ডভন্ড করে দেন, ফলে তারা অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়।⁸⁰
বিশ্লেষণ:
খন্দকের যুদ্ধ ছিল কৌশল, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার এক চূড়ান্ত বিজয়। এই যুদ্ধের পর কুরাইশদের আক্রমণ করার মতো মনোবল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন,
এই যুদ্ধের মাধ্যমে আরবের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের অনুকূলে চলে আসে এবং মদিনা একটি অজেয় শক্তিতে পরিণত হয়।
তথ্যসূত্র: নবম অধ্যায়
- ⁷¹ ইবনে কাসির, তাফসির আল-কুরআন আল-আযিম (সূরা আল-হাজ্জের তাফসির); আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১৯৩-১৯৪।
- ⁷² ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৬১০-৬১৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ২০৩-২০৫।
- ⁷³ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৬৩; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৬১৬-৬২০।
- ⁷⁴ আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ২২০-২২১; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৬৯৩-৭০৬।
- ⁷⁵ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩০৩৯; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ২৪৮-২৫০।
- ⁷⁶ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৭৮-৮৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ২৫৪-২৫৮।
- ⁷⁷ আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ২৯৩; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/২১৭।
- ⁷⁸ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪১০১; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/২২০-২২৪।
- ⁷⁹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/২২৯-২৩২; আল-কুরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩:১০-১১।
- ⁸⁰ আল-কুরআন, সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৯; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৩-৩০৪।
- ⁸¹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪১০৯।