হুদায়বিয়ার সন্ধি

দশম অধ্যায়: হুদায়বিয়ার সন্ধি (কৌশলগত বিজয়)

দশম অধ্যায়: হুদায়বিয়ার সন্ধি (কৌশলগত বিজয়)

খন্দকের যুদ্ধের পর আরবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। কুরাইশদের সামরিক অহংকার ধুলোয় মিশে গিয়েছিল এবং মদিনা একটি অজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

এই নতুন বাস্তবতায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও দাওয়াতের পথকে প্রসারিত করার দিকে মনোনিবেশ করেন। এই নীতিরই এক চমৎকার প্রতিফলন ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধি।

১০.১ উমরাহর স্বপ্ন ও শান্তিপূর্ণ যাত্রা

ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি সাহাবীদের সাথে নিরাপদে মক্কায় প্রবেশ করে উমরাহ পালন করছেন। নবীদের স্বপ্নও এক প্রকার ওহী। তাই তিনি সাহাবীদের উমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেন।⁸²

শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য:

এই যাত্রার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই যুদ্ধ ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় ১৪০০ সাহাবীকে সাথে নিয়ে শুধুমাত্র ইহরামের পোশাক পরে এবং কুরবানীর পশু (৭০টি উট) সাথে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

তাঁদের সাথে ছিল শুধু সফরের জন্য প্রয়োজনীয় তলোয়ার, যা কোষবদ্ধ ছিল। এটি ছিল তাঁদের শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের এক সুস্পষ্ট ঘোষণা।

কুরাইশদের প্রতিক্রিয়া:

কিন্তু কুরাইশরা মুসলিমদের এই শান্তিপূর্ণ যাত্রাকে সন্দেহের চোখে দেখল। তারা তাদের পুরনো শত্রুতা, অহংকার এবং সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে ভীত হয়ে পড়ল। তারা শপথ করল, যেকোনো মূল্যে মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এই উদ্দেশ্যে তারা খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করে মুসলিমদের পথরোধ করার জন্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) সংঘাত এড়ানোর জন্য পরিচিত পথ ছেড়ে এক দুর্গম ও অপরিচিত পথ ধরে মক্কার উপকণ্ঠে হুদায়বিয়া নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন।⁸³

১০.২ আলোচনা ও ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ (সন্তুষ্টির শপথ)

হুদায়বিয়ায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের কাছে তাঁর শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকজন দূত প্রেরণ করেন। কিন্তু কুরাইশরা তাদের অবস্থানে অনড় ছিল।

হজরত উসমান (রা.)-এর দূতিয়ালি:

অবশেষে, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত উসমান বিন আফফান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান, কারণ বনু উমাইয়া গোত্রের সদস্য হওয়ায় তাঁর ওপর আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা কম ছিল।

উসমান (রা.) মক্কায় গিয়ে আবু সুফিয়ানসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে আলোচনা করেন। আলোচনায় দীর্ঘ সময় লাগায় এবং কুরাইশরা তাঁকে আটকে রাখায় মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, উসমান (রা.)-কে শহীদ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক শপথ:

এই খবরে মুসলিম শিবিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বাবলা গাছের নিচে বসেন এবং সাহাবীদের কাছ থেকে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেন যে, তাঁরা উসমান (রা.)-এর রক্তের বদলা না নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবেন না, বরং আমৃত্যু লড়াই করবেন।

সাহাবীরা বিপুল উৎসাহ ও ঈমানী উদ্দীপনা নিয়ে একে একে রাসুল (সা.)-এর হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক শপথই ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ (সন্তুষ্টির শপথ) নামে পরিচিত।⁸⁴

বিশ্লেষণ:

আল্লাহ তাআলা এই শপথে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করে পবিত্র কুরআনে আয়াত নাজিল করেন:

এই ঘটনা মুসলিমদের ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং নেতার প্রতি তাঁদের নিঃশর্ত আনুগত্যের এক চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে।

১০.৩ হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তাবলি: আপাত পরাজয়, প্রকৃত বিজয়

‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’-এর সংবাদে কুরাইশরা ভীত হয়ে পড়ে এবং তারা বুঝতে পারে, মুসলমানরা এখন আর দুর্বল নয়। তারা দ্রুত উসমান (রা.)-কে মুক্তি দেয় এবং সুহাইল ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্য।

দীর্ঘ আলোচনার পর যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, তার শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:⁸⁵

  1. মুসলিমরা এই বছর উমরাহ না করে মদিনায় ফিরে যাবে। তারা আগামী বছর এসে তিন দিনের জন্য উমরাহ পালন করতে পারবে, তবে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র আনতে পারবে না।
  2. উভয় পক্ষের মধ্যে দশ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।
  3. মক্কার কোনো ব্যক্তি যদি তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় পালিয়ে যায়, তবে মুসলিমরা তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু মদিনার কোনো মুসলিম যদি মক্কায় চলে আসে, তবে কুরাইশরা তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে না।
  4. আরবের অন্যান্য গোত্রগুলো মুসলিম বা কুরাইশ—যেকোনো পক্ষের সাথে মিত্রতার চুক্তি করার স্বাধীনতা রাখবে।

সাহাবীদের প্রতিক্রিয়া:

এই চুক্তির শর্তগুলো, বিশেষ করে ৩ নম্বর শর্তটি, বাহ্যিকভাবে ছিল অত্যন্ত অপমানজনক এবং একপেশে। হজরত ওমর (রা.)-এর মতো অনেক সাহাবী প্রচণ্ড আবেগাপ্লুত ও ব্যথিত হয়ে পড়েন। তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে বলেন,

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে উত্তর দেন,

১০.৪ সন্ধির সুদূরপ্রসারী ফলাফল ও কৌশলগত তাৎপর্য

সাহাবীরা যা দেখতে পাচ্ছিলেন না, রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রজ্ঞায় তা দেখতে পাচ্ছিলেন। এই আপাত অপমানজনক চুক্তিটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়গুলোর একটি, যাকে আল্লাহ তাআলা নিজেই ‘ফাতহুম মুবিনা’ (সুস্পষ্ট বিজয়) বলে অভিহিত করেছেন।⁸⁷

ইসলামের শান্তিপূর্ণ প্রসারের সুযোগ:

দশ বছরের যুদ্ধবিরতি মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে যোগাযোগের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে। যুদ্ধের উত্তেজনামুক্ত পরিবেশে আরবের লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে জানার ও বোঝার সুযোগ পায়।

তারা মুসলিমদের উন্নত চরিত্র, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা দেখে মুগ্ধ হতে থাকে। ফলে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, তা নবুয়তের পূর্ববর্তী ১৯ বছরেও করেনি। খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর বিন আসের মতো কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ সেনাপতিরাও এই সময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন।⁸⁸

মদিনা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি:

এই চুক্তির মাধ্যমে কুরাইশরা প্রথমবারের মতো মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি সমমর্যাদার শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়।

ভবিষ্যৎ বিজয়ের ভিত্তি:

সন্ধির ৩ নম্বর শর্তটি মুসলিমদের জন্য বেদনাদায়ক হলেও এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। আবু জান্দাল ও আবু বাসিরের মতো নওমুসলিমদের মক্কায় ফেরত পাঠানো হলে, তাঁরা সেখানে না গিয়ে সিরিয়ার বাণিজ্য পথের কাছে একটি বিদ্রোহী ঘাঁটি স্থাপন করেন।

মক্কা থেকে পালিয়ে আসা নওমুসলিমরা সেখানে একত্রিত হতে থাকে এবং কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে, কুরাইশরা নিজেরাই রাসুল (সা.)-এর কাছে অনুরোধ করে এই শর্তটি বাতিল করার জন্য।⁸⁹

বিশ্লেষণ:

হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার এক অসাধারণ নিদর্শন। এটি শিক্ষা দেয় যে, বিজয় সবসময় তরবারির মাধ্যমে আসে না; বরং ধৈর্য, কৌশল এবং শান্তিপূর্ণ পথ অবলম্বন করেও বড় বিজয় অর্জন করা সম্ভব।

এই সন্ধিই পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে মক্কা বিজয়ের পথকে সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

তথ্যসূত্র: দশম অধ্যায়

  • ⁸² সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ১৬৯৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৬।
  • ⁸³ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩২০-৩২২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৭-৩১৮।
  • ⁸⁴ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪১৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৫৬; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩২০।
  • ⁸⁵ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৩১-৩৩২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩২২-৩২৩।
  • ⁸⁶ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৭১১-২৭৩২; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৩৩।
  • ⁸⁷ আল-কুরআন, সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:১।
  • ⁸⁸ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৪৯; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩২৮-৩২৯।
  • ⁸⁹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৭৩২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩২৬-৩২৭।

Ha-mim Zubaer