একাদশ অধ্যায়: বিভিন্ন রাজা ও বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত (বিশ্বজনীন দাওয়াত)
হুদায়বিয়ার সন্ধি সপ্তম হিজরিতে মুসলিমদের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দেয়। দশ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি মক্কার দিক থেকে সাময়িকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এই স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের দাওয়াতকে শুধু আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বজনীন দাওয়াত এর পরিকল্পনা করেন, তৎকালীন বিশ্বের প্রধান প্রধান সাম্রাজ্য ও শাসকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সেই যুগে মদিনার মতো একটি ছোট ভূখণ্ড থেকে রোম বা পারস্যের মতো মহাপরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের অধিপতিদের কাছে সরাসরি এমন বার্তা পাঠানো ছিল জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভাবনীয় সাহসিকতার পরিচয়।
এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো আঞ্চলিক বা গোত্রীয় ধর্ম নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য (কাফফাতাল লিন-নাস) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশ্বজনীন বার্তা। এটি বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, নবুয়তের আলো নির্দিষ্ট কোনো মরুভূমির বালুকণায় আটকে থাকার জন্য নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর অন্ধকার দূর করার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে।
১১.১ দাওয়াতের প্রস্তুতি ও কৌশল
এই বিশ্বজনীন দাওয়াতের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সুসংগঠিত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রটোকলকে সম্মান জানিয়ে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন।
নবী-মোহর অঙ্কিত সীল:
সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-কে অবগত করলেন যে, রোমান ও পারস্য রাজদরবারে সিলমোহরবিহীন কোনো চিঠির মূল্যায়ন করা হয় না। যেহেতু তৎকালীন বিশ্বে রাজকীয় চিঠিপত্র শাসকের সীলমোহর ছাড়া গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতো না, তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) রুপার একটি আংটি তৈরি করান, যাতে তিনটি লাইনে খোদাই করা ছিল: “মুহাম্মদ”, “রাসুল”, “আল্লাহ” (محمدرسول الله)। এই সিলমোহরটি অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে নিচ থেকে ওপরের দিকে লেখা হয়েছিল, অর্থাৎ সবার ওপরে ছিল ‘আল্লাহ’ শব্দটি। এই সীলমোহরই তাঁর প্রেরিত পত্রগুলোকে আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দান করে।⁹⁰ এটি শুধু একটি সিলমোহরই ছিল না, বরং এটি ছিল একত্ববাদের এক দৃশ্যমান প্রতীক।
উপযুক্ত দূত নির্বাচন:
দূতাবাসের দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবেই অত্যন্ত দক্ষ মানুষের প্রয়োজন ছিল। প্রতিটি শাসকের দরবারে পাঠানোর জন্য তিনি এমন সব সাহাবীদের নির্বাচন করেন, যাঁরা ছিলেন প্রজ্ঞাবান, বাগ্মী, সুদর্শন এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি সম্পর্কে অবগত। শত শত মাইল দুর্গম মরুভূমি ও অজানা পথ পাড়ি দিয়ে ভিনদেশি রাজদরবারে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলার জন্য এই সাহাবীরা ছিলেন অনন্য। তিনি দূত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেন। এর ফলে দাওয়াতের বার্তাটি শাসকদের কাছে তাদের নিজেদের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আবহে অত্যন্ত স্পষ্ট ও মাধুর্যপূর্ণভাবে পৌঁছেছিল।
১১.২ প্রধান শাসকদের নিকট প্রেরিত পত্র ও তাদের প্রতিক্রিয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) একই দিনে বিভিন্ন শাসকের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্রসহ দূত প্রেরণ করেন। এই দিনটি মানব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন ছিল, যখন একই উৎস থেকে সত্যের বাণী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিগুলোর রাজদরবারে এই পত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তৎকালীন বিশ্বের প্রধান চার শক্তিধর শাসকের প্রতিক্রিয়া ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং ভিন্ন ভিন্ন।
১. রোমান (বাইজান্টাইন) সম্রাট হিরাক্লিয়াস (Heraclius)
- দূত: এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হন হজরত দিহইয়া আল-কালবী (রা.)। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম সুদর্শন পুরুষ, যাঁর আকৃতি ধারণ করে অনেক সময় হজরত জিবরাইল (আ.) ওহী নিয়ে আসতেন।
- প্রতিক্রিয়া ও অনুসন্ধান: পারস্যের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হিরাক্লিয়াস তখন জেরুজালেমে অবস্থান করছিলেন। এই বিজয় উৎসবের মধ্যেই তাঁর দরবারে ইসলামের দাওয়াতী পত্র পৌঁছায়। তিনি রাসুল (সা.)-এর পত্রটি অত্যন্ত সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন এবং এই নতুন নবীর সত্যতা যাচাই করার জন্য এক অসাধারণ অনুসন্ধানের আয়োজন করেন। সৌভাগ্যক্রমে, আবু সুফিয়ান (তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) একটি বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সম্রাট নির্দেশ দিলেন মক্কা থেকে আগত কোনো ব্যক্তিকে তাঁর সামনে উপস্থিত করতে, যাতে তিনি নবীর বংশ ও চরিত্র সম্পর্কে জানতে পারেন।
হিরাক্লিয়াস তাঁকে তাঁর সভাসদদের সামনে ডেকে পাঠান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে বেশ কিছু যৌক্তিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এই নবীর বংশমর্যাদা কেমন, তাঁর অনুসারীরা গরিব নাকি ধনী, তিনি কখনো মিথ্যা বলেছেন কি না বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন কি না। আবু সুফিয়ান চরম শত্রু হওয়া সত্ত্বেও আরবদের সত্যবাদিতার অহংকারের কারণে কোনো মিথ্যা তথ্য দিতে পারেননি।
আবু সুফিয়ানের প্রতিটি উত্তর শোনার পর হিরাক্লিয়াস এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন: “তুমি যা বলেছ, তা যদি সত্য হয়, তবে তিনি শিগগিরই আমার এই পদতলের ভূমিরও মালিক হবেন। আমি জানতাম একজন নবীর আগমন ঘটবে, কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য থেকে হবেন, তা ভাবিনি। আমি যদি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারতাম, তবে অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতাম এবং তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।”⁹¹
- বিশ্লেষণ: এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, হিরাক্লিয়াস বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের সত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের জ্ঞান থাকার কারণে তাঁর কাছে সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু তিনি তাঁর পাদ্রী ও সভাসদদের তীব্র বিরোধিতা এবং নিজের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাজ্যের সিংহাসন তাঁর কাছে পরকালের মুক্তির চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে হয়েছিল। তাঁর ঘটনা প্রমাণ করে, সত্যকে চেনার পরও জাগতিক মোহ ও ক্ষমতার লোভ কীভাবে মানুষকে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে।
২. পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ (Khosrau II)
- দূত: পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাটের দরবারে পত্র নিয়ে যান হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস-সাহমী (রা.)।
- প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি: পারস্যের শাসকরা নিজেদের দেবতার অবতার মনে করত। তাই পারস্য সম্রাট খসরু ছিলেন দাম্ভিক ও অহংকারী। তাঁর দরবারের নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে যখন সত্যের বার্তা উপস্থাপন করা হলো, তখন সে তা মেনে নিতে পারেনি। তিনি যখন দেখলেন পত্রের শুরুতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম তাঁর নামের আগে লেখা হয়েছে, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং পত্রটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। একজন সাধারণ আরবের এই ধৃষ্টতা তাঁর রাজকীয় অহংকারে চরম আঘাত হেনেছিল।
যখন এই খবর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি শান্তভাবে বলেন: “আল্লাহ তার সাম্রাজ্যকেও এভাবেই টুকরো টুকরো করে ফেলবেন।”
রাসুল (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত এই ঐশ্বরিক ভবিষ্যদ্বাণী নিষ্ফল হওয়ার ছিল না। আশ্চর্যজনকভাবে, এর কিছুদিন পরই খসরু তার নিজ পুত্র শিরওয়াইহের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এবং পারস্য সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা তার পতনকে ত্বরান্বিত করে।⁹²
- বিশ্লেষণ: খসরুর প্রতিক্রিয়া ছিল অহংকার ও দাম্ভিকতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। ক্ষমতার মদমত্ততায় সে স্রষ্টার প্রেরিত বার্তাকে অবজ্ঞা করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। সত্যকে বিচার করার পরিবর্তে বাহ্যিক প্রটোকল নিয়ে ব্যস্ত থেকে সে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই এই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য মুসলিমদের পদানত হয়ে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩. হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী (Negus)
- দূত: হাবশার (ইথিওপিয়া) দরবারে প্রেরিত হন হজরত আমর ইবনে উমাইয়া (রা.)।
- প্রতিক্রিয়া: হাবশার দরবার মুসলিমদের কাছে পূর্ব পরিচিত ছিল। বাদশাহ নাজ্জাশী, যিনি পূর্বেই মুসলিম মুহাজিরদের আশ্রয় দিয়ে তাঁর ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তিনি পত্রটি পেয়ে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেন। রাজকীয় সিংহাসনের অহংকার ত্যাগ করে তিনি একজন বিনীত দাসের মতো স্রষ্টার বার্তার প্রতি সম্মান জানান। তিনি পত্রটি চোখে ছোঁয়ান, সিংহাসন থেকে নেমে মাটিতে বসেন এবং বিনীতভাবে বলেন:
তিনি শুধু মৌখিক স্বীকৃতিতেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।⁹³ তাঁর এই ইসলাম গ্রহণ মদিনার মুসলিমদের জন্য এক বিরাট আনন্দের সংবাদ ছিল।
- বিশ্লেষণ: অহংকারমুক্ত মন কীভাবে দ্রুত সত্য গ্রহণ করতে পারে, তা এই ঘটনায় সুস্পষ্ট। নাজ্জাশীর ঘটনা প্রমাণ করে, একটি নির্মল ও সত্য অনুসন্ধানী হৃদয় কীভাবে সহজেই সত্যকে গ্রহণ করতে পারে। পার্থিব ক্ষমতা তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। তাঁর ইসলাম গ্রহণ ছিল ইসলামের দাওয়াতের প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় তাঁর গায়েবানা জানাজা আদায় করেছিলেন।
৪. মিসরের শাসক মুকাউকিস
- দূত: মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পত্র নিয়ে গমন করেন হজরত হাতিব ইবনে আবি বালতা’আ (রা.)।
- প্রতিক্রিয়া: মিসর তখন সরাসরি রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও এর নিজস্ব একটি স্বকীয়তা ছিল। মুকাউকিস ছিলেন মিসরে বাইজান্টাইন সম্রাটের অধীনস্থ গভর্নর। কপ্টিক খ্রিস্টানদের এই নেতা ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলেন।
তিনি রাসুল (সা.)-এর পত্রটি সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন এবং দূতের সাথে অত্যন্ত ভদ্র আচরণ করেন। হাতিব (রা.)-এর সাথে তাঁর দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়।
তিনি একটি কূটনৈতিক উত্তর দেন, যেখানে তিনি নবুয়তের সম্ভাবনাকে স্বীকার করলেও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ভেবেছিলেন শেষ নবী সিরিয়া থেকে আবির্ভূত হবেন, আরব ভূখণ্ড থেকে নয়। তবে, তিনি রাসুল (সা.)-এর জন্য মারিয়া কিবতিয়াসহ কিছু মূল্যবান উপহার পাঠান।⁹⁴
- বিশ্লেষণ: মুকাউকিস সত্য উপলব্ধি করার কাছাকাছি পৌঁছেও নিজের বিশ্বাস ও রাজকীয় পদের কারণে ইসলাম গ্রহণ থেকে পিছিয়ে যান। মুকাউকিসের প্রতিক্রিয়া ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সতর্কতার পরিচায়ক। তিনি পারস্য সম্রাটের মতো ঔদ্ধত্য দেখাননি, আবার নাজ্জাশীর মতো আত্মসমর্পণও করেননি। তিনি সরাসরি শত্রুতা না করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রেরিত উপহার রাসুল (সা.) অত্যন্ত সহৃদয়তার সাথে গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১১.৩ বিশ্বজনীন দাওয়াতের তাৎপর্য
পৃথিবীর প্রধান পরাশক্তিগুলোর কাছে একযোগে এমন পত্র প্রেরণ মানব ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ছিল। এই ঐতিহাসিক পত্র প্রেরণ ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এর মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র একটি আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বলয়ে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে:
- ইসলামের বিশ্বজনীনতা ঘোষিত হয়: জাহেলিয়াতের যুগে ধর্ম ছিল মূলত গোত্রভিত্তিক। কিন্তু ইসলাম যে শুধু আরবদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য—এই বার্তা স্পষ্টভাবে পৃথিবীর প্রধান প্রধান রাজদরবারে পৌঁছে যায়। এটি প্রমাণ করে আল্লাহর রহমত পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়।
- ‘ইতমামুল হুজ্জাহ’ (প্রমাণ সম্পন্ন করা): কিয়ামতের দিন যেন কোনো জাতি বলতে না পারে যে তাদের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছায়নি, তাই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পৃথিবীর শাসকদের কাছে সত্যের সাক্ষ্য পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে পরকালে তারা অজ্ঞতার অজুহাত দিতে না পারে। রাজারা যেহেতু তাদের প্রজাদের প্রতিনিধি, তাই তাদের কাছে পৌঁছানো মানে সমগ্র জাতির কাছে পৌঁছানো।
- ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন: এই দাওয়াত ছিল মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট রূপরেখা। এই দাওয়াত ভবিষ্যতে ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য সাম্রাজ্যের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে। যাঁরা চিঠির প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন, তাঁরা পরোক্ষভাবে মুসলিমদের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যারা সম্মান দেখিয়েছে, তাদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে, আর যারা ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তাদের সাথে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। পারস্যের সাথে পরবর্তী সংঘাত তারই বাস্তব প্রমাণ।
এই উদ্যোগ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতা এবং তাঁর মিশনের প্রতি গভীর আস্থার এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। নিঃসম্বল ও জাগতিক ক্ষমতাহীন অবস্থায় পৃথিবীর পরাশক্তিদের চোখে চোখ রেখে সত্যের এই উদাত্ত আহ্বান বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল—এক নতুন সভ্যতার সূর্য উদিত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: একাদশ অধ্যায়
- ⁹⁰ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৫৮৭২, ৫৮৭৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৩২।
- ⁹¹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৩৪-৩৩৮।
- ⁹² সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪৪৩; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৩৮-৩৩৯।
- ⁹³ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৫৯; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪০।
- ⁹⁴ ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা’আদ, ৩/৬০৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪১-৩৪২।