রাসুলুল্লাহর চারিত্রিক মাধুর্য

সপ্তদশ অধ্যায়: রাসুলুল্লাহ সা. এর চারিত্রিক মাধুর্য (কুরআনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি)

সপ্তদশ অধ্যায়: রাসুলুল্লাহর চারিত্রিক মাধুর্য (কুরআনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি)

পৃথিবীর বুকে অসংখ্য মহামানব এসেছেন, যাঁরা তাঁদের নিজস্ব কর্মগুণে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বা সামরিক দক্ষতায় মানব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহত্ত্ব ছিল অনন্য ও তুলনাহীন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ কোনো বাহ্যিক অলৌকিক ঘটনা (মুজিজা) ছিল না, বরং তাঁর নিজের জীবন ও নিষ্কলুষ চরিত্রই ছিল তাঁর নবুয়তের শ্রেষ্ঠ দলিল।

তাঁর স্ত্রী, যিনি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কাছের সাক্ষী ছিলেন, সেই হজরত আয়েশা (রা.)-কে যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি অত্যন্ত গভীর প্রজ্ঞার সাথে এক কথায় এর সারমর্ম তুলে ধরেছিলেন:

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যেসকল মহৎ গুণাবলির কথা বলেছেন, রাসুল (সা.) ছিলেন সেগুলোর বাস্তব ও নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। কুরআন যদি হয় একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ (Theory), তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল তার শতভাগ প্রায়োগিক রূপ (Practical)। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য এমন এক আলোকবর্তিকা ছিল, যা জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত একটি বর্বর জাতিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সভ্য জাতিতে রূপান্তরিত করেছিল। এই অধ্যায়ে আমরা তাঁর চরিত্রের কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করব, যা তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৭.১ সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা (‘আস-সিদক’ ও ‘আল-আমানাহ’)

আরব সমাজ যখন মিথ্যা, প্রতারণা, লুণ্ঠন ও গোত্রীয় দ্বন্দ্বে নিমজ্জিত, তখনো তিনি ছিলেন সত্যের এক অটল পর্বত। নবুয়তের পূর্বে যৌবনকালেই তিনি তাঁর অসাধারণ সততার জন্য মক্কাবাসীদের কাছে ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) ও ‘আল-আমিন’ (বিশ্বাসী/আমানতদার) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পবিত্র কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় ‘হাজরে আসওয়াদ’ (কালো পাথর) স্থাপন নিয়ে যখন আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল, তখন ফয়সালাকারী হিসেবে তাঁকে আসতে দেখে সবাই সমস্বরে বলে উঠেছিল, “আল-আমিন এসেছে, আমরা তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট।”

নবুয়তের পরেও চরম প্রতিকূলতার মাঝে এই দুটি গুণ তাঁর চরিত্রের ভিত্তি হিসেবে অটুট ছিল।

শত্রুর মুখেও সত্যের সাক্ষ্য:

তাঁর ঘোরতর শত্রু, যেমন আবু জাহেল, ব্যক্তিগতভাবে জানত যে তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না। একবার আবু জাহেলকে একান্তে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “মুহাম্মদ কি সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী?” সে উত্তরে বলেছিল,

এই চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, তাদের বিরোধিতা ছিল মূলত গোত্রীয় অহংকার, হিংসা ও ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে, রাসুল (সা.)-এর চরিত্রের ওপর কোনো সন্দেহের কারণে নয়। তারা সত্যকে চিনতে পেরেও কেবল জাগতিক মর্যাদাহানির ভয়ে তা অস্বীকার করেছিল। হিরাক্লিয়াসের রাজদরবারে দাঁড়িয়ে কট্টর শত্রু আবু সুফিয়ানও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, নবুয়ত দাবির আগে মুহাম্মদ (সা.) জীবনে একটিও মিথ্যা কথা বলেননি।

বিশ্লেষণ:

তাঁর এই প্রশ্নাতীত সত্যবাদিতাই ছিল তাঁর দাওয়াতের মূল ভিত্তি। সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি যখন মক্কাবাসীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পেছনে একটি শত্রু বাহিনী লুকিয়ে আছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” সবাই একবাক্যে বলেছিল, “হ্যাঁ, কারণ আমরা আপনাকে আজীবন সত্যবাদী পেয়েছি।” কারণ, যে ব্যক্তি দীর্ঘ চল্লিশ বছর সাধারণ জাগতিক বিষয়ে কখনো মিথ্যা বলেননি, তিনি কীভাবে পরিণত বয়সে হঠাৎ করে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলতে পারেন?

তাঁর এই চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রতিপক্ষের সকল অপপ্রচারকে দুর্বল করে দিত। এমনকি হিজরতের রাতেও, যখন এই শত্রুরাই তাঁকে হত্যার জন্য তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল, তখনও তিনি হজরত আলি (রা.)-কে তাঁর বিছানায় শুইয়ে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যেন তিনি সকালে শত্রুদের গচ্ছিত আমানতগুলো তাদের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তবেই মদিনায় আসেন। যারা তাঁকে হত্যা করতে এসেছে, তাদের আমানত সযত্নে ফিরিয়ে দেওয়ার এই আমানতদারিতা বিশ্ব ইতিহাসে সম্পূর্ণ বিরল।

১৭.২ ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার (‘আল-আদল’)

জাহেলিয়াতের যুগে ন্যায়বিচার ছিল সম্পূর্ণ গোত্রীয় পেশিশক্তি ও সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষমতাবানরা অপরাধ করে পার পেয়ে যেত, আর দুর্বলদের ওপর শাস্তির খড়্গ নেমে আসত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিচারব্যবস্থা ছিল চরম নিরপেক্ষ এবং সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়, মুসলিম-অমুসলিম—সকলেই ছিল আইনের দৃষ্টিতে সমান।

আইনের চোখে সকলে সমান:

একবার মক্কার অন্যতম অভিজাত বনু মাখযুম গোত্রের ফাতেমা নাম্নী এক নারী চুরির দায়ে অভিযুক্ত হন। তাঁর গোত্রের লোকেরা এই শাস্তিকে চরম অপমানজনক মনে করে তাঁকে বাঁচানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। তারা রাসুল (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবী, যাঁর পিতা জায়েদ (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর পালকপুত্র এবং যাঁকে ‘হিব্বু রাসুলিল্লাহ’ (রাসুলের প্রিয়পাত্র) বলা হতো, সেই উসামা বিন জায়েদ (রা.)-কে সুপারিশ করার জন্য পাঠায়।

উসামা (রা.) সরল মনে সুপারিশ করতেই রাসুল (সা.)-এর চেহারা রাগে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন:

নিজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার প্রদান:

তাঁর ন্যায়বিচারের শ্রেষ্ঠতম রূপ দেখা যায় তাঁর ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বে। তিনি অসুস্থ শরীরে মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, “আমি যদি কারো পিঠে আঘাত করে থাকি, তবে এই আমার পিঠ, সে যেন প্রতিশোধ গ্রহণ করে। আমি যদি কারো সম্মান নষ্ট করে থাকি, তবে সে যেন আমার সম্মান নষ্ট করে তার বদলা নেয়।” উকাশা (রা.) নামক এক সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন, “এক যুদ্ধে আপনার লাঠির আঘাত আমার খালি পিঠে লেগেছিল, আমি তার বদলা নিতে চাই।” রাসুল (সা.) বিনা দ্বিধায় নিজের পিঠ উন্মুক্ত করে দিলেন। উকাশা (রা.) প্রতিশোধ নেওয়ার বদলে নবীজির মোহরে নবুয়তে চুম্বন করে কেঁদে ফেললেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন স্বেচ্ছায় জবাবদিহিতা মানব সভ্যতার জন্য এক চরম বিস্ময়।

বিশ্লেষণ:

এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ইসলামে আইনের শাসনের এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যেখানে আইনের ঊর্ধ্বে কেউই নন, এমনকি স্বয়ং নবীর পরিবার বা নবী নিজেও নন। এটি জাহেলিয়াতের সেই বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দেয়, যেখানে ন্যায়বিচার ছিল ক্ষমতা ও বংশমর্যাদার অধীন। রাসুল (সা.) প্রমাণ করেছিলেন যে, একটি সমাজের স্থায়িত্ব ও শান্তি কেবল তখনই নিশ্চিত হয়, যখন তার বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ অন্ধ ও পক্ষপাতহীন হয়।

১৭.৩ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা (‘আস-সবর’)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল ধৈর্যের এক মহাকাব্য। নবুয়তের ২৩ বছরে তিনি যে পরিমাণ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়।

মক্কার তেরো বছরে কাফিরদের নির্মম উপহাস, শারীরিক নির্যাতন এবং ‘শিআবে আবি তালিব’-এ তিন বছরের অমানবিক সামাজিক বয়কটের মতো কঠিন পরীক্ষা তিনি অকল্পনীয় ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেছেন। তায়েফের ময়দানে যখন তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করা হয়েছিল, তখন পাহাড়ের দায়িত্বে থাকা ফেরেশতা এসে অনুমতি চেয়েছিলেন, “আপনি চাইলে দুই পাহাড় একত্রিত করে এদের পিষে ফেলি।” কিন্তু তিনি অভিশাপ দেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছিলেন।

পারিবারিক জীবনে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং পুত্র ইবরাহিম, কাসিম, আবদুল্লাহ ও কন্যা রুকাইয়া, জয়নব, উম্মে কুলসুমসহ প্রায় সকল সন্তানকে (ফাতেমা রা. ব্যতীত) মৃত্যুবরণ করতে দেখেছেন। একজন পিতার জন্য নিজ হাতে একে একে ছয়জন সন্তানকে কবরে শায়িত করার চেয়ে বড় মানসিক আঘাত আর কী হতে পারে! কিন্তু তাঁর মুখ থেকে কখনো নিয়তির বিরুদ্ধে একটিও অভিযোগ বের হয়নি।

ওহুদের প্রান্তরে যখন বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তাঁর নিজের মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়েছিল, দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছিল এবং হুনাইনের যুদ্ধে যখন বিশাল মুসলিম বাহিনী আকস্মিক হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি একাই পর্বতের মতো অটল থেকে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন।

বিশ্লেষণ:

তাঁর ‘সবর’ বা ধৈর্য কোনো নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ ছিল না, বরং এটি ছিল আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবিচল সংগ্রাম। তিনি কখনো হতাশ হননি বা আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তাঁর এই গুণই মুসলিম উম্মাহকে শিখিয়েছে যে, চরম সংকট, শোক ও কঠিনতম মুহূর্তেও কীভাবে আশাবাদী, শান্ত ও দৃঢ় থাকতে হয়।

১৭.৪ ক্ষমা ও দয়া (‘আল-আফউ’ ও ‘আর-রাহমাহ’)

আল্লাহ তাআলা তাঁকে ‘রহমাতুললিল আলামিন’ (সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত) হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি আচরণে এই অসীম গুণের প্রতিফলন ঘটেছে।

মক্কা বিজয়ের ক্ষমা ও চরম শত্রুদের প্রতি দয়া:

তাঁর ক্ষমার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হলো মক্কা বিজয়। যে শত্রুরা তাঁকে ২১ বছর ধরে অবর্ণনীয় কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়েছে, তাঁকে হত্যার নিখুঁত পরিকল্পনা করেছে, তাঁর প্রিয় সাহাবীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিকৃত করে হত্যা করেছে—বিজয়ী হিসেবে তিনি তাদের সকলকে এক বাক্যে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দেন। হাববার ইবনে আল-আসওয়াদ, যার বর্শার আঘাতে রাসুল (সা.)-এর কন্যা জয়নব (রা.) উট থেকে পড়ে গিয়ে গর্ভপাত ও পরবর্তীতে ইন্তেকাল করেছিলেন, সেও যখন ভয়ে ভয়ে ক্ষমা চাইতে এল, রাসুল (সা.) তাকেও ক্ষমা করে দিলেন।

এই ক্ষমা কোনো দুর্বলতা থেকে উৎসারিত ছিল না, বরং ১০ হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দয়া প্রদর্শন করেছিলেন।

ব্যক্তিগত প্রতিশোধহীনতা ও প্রাণীকুলের প্রতি দয়া:

একবার একজন রূঢ় স্বভাবের বেদুইন তাঁর চাদর ধরে এত জোরে টান দিয়েছিল যে তাঁর মোবারক গলায় চাদরের পাড়ের গভীর দাগ পড়ে গিয়েছিল। সে চরম রূঢ়ভাবে রাসুলের কাছে আর্থিক সাহায্যের আবেদন করলে, রাসুল (সা.) তার দিকে তাকিয়ে রাগ করার বদলে শুধু মৃদু হাসলেন এবং সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন তাকে কিছু দান করার জন্য।¹³⁸

যে ইহুদি নারী খায়বারে তাঁকে ভেড়ার মাংসে তীব্র বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করেছিল, ব্যক্তিগতভাবে তিনি তাকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।¹³⁹

তাঁর দয়া শুধু মানুষের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না। একবার এক আনসারি সাহাবীর উট রাসুল (সা.)-কে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তিনি উটটির মাথায় হাত বুলিয়ে মালিককে ডেকে সতর্ক করে বলেন, “এই অবলা প্রাণীর ব্যাপারে কি তুমি আল্লাহকে ভয় করো না? সে আমার কাছে অভিযোগ করছে যে তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং বেশি কাজ চাপিয়ে দাও।”

বিশ্লেষণ:

তাঁর এই অভাবনীয় ক্ষমাশীলতা আরবের শত বছরের প্রতিশোধের বৃত্তকে চিরতরে ভেঙে দিয়ে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করার শিক্ষা দেয়। তাঁর দয়া প্রমাণ করেছিল যে, তরবারি কেবল রাজ্য জয় করতে পারে বা মানুষকে বাহ্যিকভাবে পদানত করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা ও ক্ষমা মানুষের অন্তর জয় করে এবং তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।

১৭.৫ বিনয় ও নম্রতা (‘আত-তাওয়াদু’)

সমগ্র আরবের অবিসংবাদিত (undisputed) শাসক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনে সামান্যতম অহংকারের ছাপ ছিল না। রোম বা পারস্যের সম্রাট (কায়সার ও কিসরা)-দের মতো তাঁর কোনো সিংহাসন, জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ বা রাজকীয় দেহরক্ষী ছিল না।

সাধারণের সাথে একাত্মতা ও নিজের কাজ নিজে করা:

তিনি সাহাবীদের সাথে এমনভাবে মিশে থাকতেন যে, কোনো বহিরাগত বা ভিনদেশি এসে তাঁকে আলাদাভাবে চিনতে পারত না। তাদের মজলিসে এসে জিজ্ঞেস করতে হতো, “আপনাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে?”

একবার একজন লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এসে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। রাসুল (সা.) অত্যন্ত স্নেহভরে তাকে কাছে ডেকে বললেন,

তিনি মজলিসের যেখানে খালি জায়গা পেতেন, সাধারণ মানুষের মতো সেখানেই বসে পড়তেন। মাটির ওপর, চাটাইয়ে বা বালুর ওপর বসতে তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না। সাহাবীদেরকে তাঁর সম্মানে বাদশাহদের মতো দাঁড়াতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করতেন।¹⁴⁰ তিনি নিজের কাপড় ও জুতো নিজে মেরামত করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন, ঘর ঝাড়ু দিতেন এবং পরিবারের কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য করতেন।

মদিনার অলিগলিতে তিনি গরিব, মিসকিন, ইয়াতিম ও বিধবাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তাদের সাথে অনায়াসে হেঁটে যেতেন। কেউ তাঁর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনতেন, হাত মেলালে তিনি কখনো আগে নিজের হাত টেনে নিতেন না।

বিশ্লেষণ:

তাঁর এই অকৃত্রিম বিনয় ছিল তাঁর গভীর আল্লাহভীতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিফলন। তিনি জানতেন, সকল গৌরব, মহত্ত্ব ও ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাঁর এই গুণ তাঁকে জনগণের প্রকৃত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, কোনো প্রতাপশালী বা স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে নয়। তিনি শিখিয়েছেন, মানুষ যত বড় হবে, জ্ঞানের গভীরতা যত বাড়বে, তার বিনয় তত বৃদ্ধি পাবে।

উপসংহার:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই চারিত্রিক গুণাবলি কোনো বিচ্ছিন্ন মর্যাদা বা সাময়িক প্রদর্শনীর বিষয় ছিল না, বরং এগুলো ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর চরিত্রই ছিল তাঁর দাওয়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নীরব মাধ্যম।

তিনি যা বলতেন, তা নিজের জীবনে নিখুঁতভাবে পালন করে দেখাতেন। তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য ছিল না। তাঁর এই অতুলনীয় আখলাক (চরিত্র) বা মাধুর্যই ছিল সেই শক্তিশালী চুম্বক, যা মানুষকে অনায়াসে ইসলামের দিকে আকর্ষণ করত এবং মানবজাতিকে জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকার যুগ থেকে পরম সত্যের আলোতে নিয়ে এসেছিল। কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল মানুষের জন্য তাঁর জীবনই হলো মুক্তির একমাত্র পাথেয়।

তথ্যসূত্র: সপ্তদশ অধ্যায়: রাসুলুল্লাহর চারিত্রিক মাধুর্য

  • ¹³⁵ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৪৮; মুসনাদে আহমাদ।
  • ¹³⁶ তাফসির ইবনে কাসির, (সূরা আল-আন’আম, আয়াত ৩৩-এর ব্যাখ্যা); সিরাতে ইবনে হিশাম।
  • ¹³⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৬৭৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৮৮।
  • ¹³⁸ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩১৪৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫৭।
  • ¹³⁹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৬১৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯০। যদিও ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করলেও, সাহাবী বিশর (রা.)-এর মৃত্যুর কারণে কিসাস হিসেবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
  • ¹⁴⁰ জামে তিরমিযী, হাদিস নং ২৭৫৪; শামায়েলে তিরমিযী।

Ha-mim Zubaer