রাসুল সা. এর মু’জিযা

পরিশিষ্ট-১: রাসুল সা. এর মু’জিযাসমূহ

ভূমিকা: রাসুল সা. এর মু’জিযার তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মু’জিযা (Mu’jizah) শব্দটি আরবি ‘আজযুন’ থেকে নির্গত, যার অর্থ অক্ষম করা। ইসলামি পরিভাষায় মু’জিযা হলো সেই অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের নবুয়তের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তাঁদের মাধ্যমে ঘটান, যেন অস্বীকারকারীরা তা খণ্ডন করতে অক্ষম হয়। এটি মানুষের সম্মিলিত জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং জাগতিক কার্যকারণ (Cause and Effect) সূত্রের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে নবীর পেছনে এক মহাজাগতিক ও সর্বশক্তিমান সত্তার সরাসরি সমর্থন রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবীকে এমন মু’জিযা দান করেছেন, যা সেই যুগের মানুষের পারদর্শিতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুসা (আ.)-এর যুগে জাদুর প্রচলন ছিল, তাই তাঁকে লাঠি ও উজ্জ্বল হাতের মু’জিযা দেওয়া হয়েছিল যা জাদুকরদের হার মানায়। ঈসা (আ.)-এর যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছিল, তাই তাঁকে অন্ধকে দৃষ্টিদান ও মৃতকে জীবিত করার মু’জিযা দেওয়া হয়েছিল। আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আরবরা ভাষা, সাহিত্য ও বাগ্মিতায় চরম উৎকর্ষ সাধন করেছিল। তাই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ, চিরন্তন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মু’জিযা হিসেবে অবতীর্ণ হয় ‘আল-কুরআন’, যার ভাষাগত সৌন্দর্য, শৈলী, ভবিষ্যদ্বাণী এবং বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা আজ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।

তবে কুরআন ছাড়াও আল্লাহ তাঁকে অসংখ্য দৃশ্যমান ও স্পর্শযোগ্য (tangible/perceptible) মু’জিযা দান করেছিলেন, যা তাঁর সাহাবীরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং যা মুতাওয়াতির (অগণিত বর্ণনাকারীর সূত্রে বর্ণিত, যার মধ্যে মিথ্যার সম্ভাবনা শূন্য) হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। নিচে বিভিন্ন প্রকারের মু’জিযার বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো:

ক) মহাজাগতিক ও মহাকাশীয় মু’জিযা

চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ (শাক্কুল কমার):

হিজরতের প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে মক্কার কাফিররা (বিশেষ করে আবু জাহেল, ওয়ালিদ বিন মুগিরা ও আস ইবনে ওয়াইল) যখন নবুয়তের এমন এক নিদর্শন দাবি করে, যা কোনো জাদুকরের পক্ষে পৃথিবীর বুকে করা সম্ভব নয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর শাহাদাত আঙুল দিয়ে আকাশের চাঁদের দিকে ইশারা করেন।

সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণিমার চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুটি স্পষ্ট খণ্ড হয়ে যায়। একটি খণ্ড আবু কুবাইস পাহাড়ের ওপর এবং অন্য খণ্ডটি কু’আইকি’আন পাহাড়ের ওপর দৃশ্যমান হয়। রাসুল (সা.) সমবেত সাহাবী ও কাফিরদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোমরা সাক্ষী থাকো।” কিছুক্ষণ পর খণ্ড দুটি আবার একত্রিত হয়ে যায়।

মক্কার কাফিররা তখনো একে ‘শক্তিশালী জাদু’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু আবু জাহেল প্রস্তাব দিল, “মুহাম্মদের জাদু শুধু মক্কার ওপর চলতে পারে, বাইরের যাত্রীদের ওপর নয়। আমরা বাইরের কাফেলাগুলোর জন্য অপেক্ষা করব।” পরবর্তীতে সিরিয়া ও ইয়েমেন থেকে আগত একাধিক কাফেলা মক্কায় পৌঁছে ঠিক একই সময়ে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনার সাক্ষ্য দেয়। এই মহাজাগতিক ঘটনাটি পবিত্র কুরআনেও চিরস্থায়ীভাবে উল্লেখিত হয়েছে:

“কিয়ামত আসন্ন এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোনো নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে: এতো এক চলমান জাদু।” (সূরা আল-কামার: ১-২)।¹⁵⁴

রাসুল সা. এর মু'জিযা
রাসুল সা. এর মু’জিযা

ইসরা ও মিরাজ (রাত্রিকালীন ও ঊর্ধ্বাকাশের ভ্রমণ):

নবুয়তের একাদশ বছরে, যখন রাসুল (সা.) তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবকে হারিয়ে ‘আমুল হুযন’ বা শোকের বছর পার করছিলেন এবং তায়েফবাসীর অত্যাচারে জর্জরিত ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য এই অভাবনীয় ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

এক রাতের অতি অল্প সময়ের মধ্যে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে ‘বোরাক’ নামক ঐশী বাহনে চড়ে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ (ইসরা) এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ, সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ (মিরাজ) ছিল মানব ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও মহাজাগতিক মু’জিযা।

এই সফরে তিনি মসজিদুল আকসায় পূর্ববর্তী সকল নবীর ইমামতি করেন, জান্নাত-জাহান্নাম স্বচক্ষে দর্শন করেন এবং উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ঐশ্বরিক উপহার লাভ করেন। সকালে মক্কায় ফিরে তিনি যখন এই ঘটনার বর্ণনা দেন, তখন কাফিররা তাঁকে মিথ্যে প্রমাণের জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসের (যা তিনি এর আগে কখনো দেখেননি) খুঁটিনাটি জানতে চায়। আল্লাহ তাআলা তখন বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাঁর চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তিনি প্রতিটি প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দেন।¹⁵⁵

খ) প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর মু’জিযা

আঙুলের ফাঁক থেকে পানি নির্গত হওয়া:

হুদায়বিয়ার প্রান্তরে (ষষ্ঠ হিজরি) প্রায় ১৪০০ সাহাবী যখন প্রচণ্ড গরমে পানির অভাবে চরম সংকটে পড়েন, তখন তাঁদের ওযু বা পান করার মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। সাহাবীরা রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে তাঁদের অসহায়ত্বের কথা জানান। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন একটি চামড়ার পাত্রে নিজের মোবারক হাত রাখলে তাঁর আঙুলগুলোর ফাঁক থেকে স্বচ্ছ ঝর্ণার মতো পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

সকল সাহাবী তৃপ্তি সহকারে সেই পানি পান করেন, ওযু করেন এবং তাদের সাথে থাকা সকল পাত্র কানায় কানায় পূর্ণ করে নেন। হজরত জাবির (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি বলেন, “আমরা যদি এক লক্ষও হতাম, তবুও সেই পানি আমাদের জন্য যথেষ্ট হতো।” মুসা (আ.)-এর লাঠির আঘাতে পাথর থেকে পানি বের হওয়ার চেয়ে রক্ত-মাংসের আঙুলের ফাঁক থেকে পানি বের হওয়ার এই মু’জিযা ছিল আরও বেশি বিস্ময়কর।¹⁵⁶

অল্প খাদ্যে বহু মানুষের ভোজন:

খন্দকের যুদ্ধের (পঞ্চম হিজরি) সময় মদিনায় চরম খাদ্যাভাব ও তীব্র শীত চলছিল। সাহাবীরা পেটে পাথর বেঁধে পরিখা খনন করছিলেন। রাসুল (সা.)-এর পেটেও দুটি পাথর বাঁধা দেখে হজরত জাবির (রা.)-এর হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি তাঁর বাড়িতে গিয়ে একটি ছোট বকরির বাচ্চা জবাই করেন এবং তাঁর স্ত্রী সামান্য যব দিয়ে রুটি প্রস্তুত করেন, যা বড়জোর চার-পাঁচজনের জন্য যথেষ্ট ছিল।

জাবির (রা.) গোপনে রাসুল (সা.)-কে দাওয়াত দিলে, রাসুল (সা.) পরিখা খননরত পুরো এক হাজার সাহাবীকে নিয়ে জাবিরের বাড়িতে উপস্থিত হন। তিনি নিজের হাতে খাবারে বরকতের দোয়া করেন এবং বণ্টন করতে শুরু করেন। এক হাজার সাহাবী পেট ভরে খাওয়ার পরেও দেখা গেল, পাত্রে মাংস ও রুটি আগের মতোই অক্ষত ও অবশিষ্ট রয়ে গেছে। এমন ঘটনা আবু হুরায়রা (রা.)-এর এক পেয়ালা দুধের ক্ষেত্রে এবং তাবুক অভিযানেও সংঘটিত হয়েছিল।¹⁵⁷

বৃষ্টির জন্য দোয়া ও তাৎক্ষণিক ফলাফল:

একবার মদিনায় চরম খরা দেখা দিলে গবাদিপশু ও ফসল ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়। এক বেদুইন জুমার খুতবার সময় মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করার সকাতর অনুরোধ জানান। রাসুল (সা.) হাত তুলে দোয়া করার সাথে সাথেই পরিষ্কার আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে এবং এমন মুষলধারে ভারি বর্ষণ শুরু হয় যে, পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত মদিনায় একনাগাড়ে বৃষ্টি হতে থাকে।

পরবর্তী জুমায় সেই একই ব্যক্তি আবার দাঁড়িয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! অতিবৃষ্টিতে এখন বাড়িঘর ভেঙে পড়ার উপক্রম, বৃষ্টি থামানোর জন্য দোয়া করুন।” রাসুল (সা.) মুচকি হেসে দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ! আমাদের ওপর নয়, বরং আমাদের আশেপাশে (পাহাড় ও উপত্যকায়) বৃষ্টি দিন।” দোয়া শেষ হতে না হতেই মদিনার ওপর থেকে মেঘ সরে গিয়ে চারপাশের উপত্যকায় বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকে। এটি প্রমাণ করে মহাপ্রকৃতির ওপর আল্লাহর হুকুমে নবীর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ।¹⁵⁸

গ) উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের আনুগত্য

খেজুর গাছের কাণ্ডের ক্রন্দন (উসতুওয়ানায়ে হান্নানা):

মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি শুকিয়ে যাওয়া খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে জুমার খুতবা দিতেন। যখন সাহাবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, তখন তাঁর জন্য তিন ধাপবিশিষ্ট একটি কাঠের মিম্বর তৈরি করা হলো। প্রথম দিন তিনি যখন সেই কাণ্ডটি ছেড়ে নতুন মিম্বরে উঠলেন, তখন সেই জড় ও শুষ্ক কাণ্ডটি রাসুল (সা.)-এর বিরহে একটি গর্ভবতী উটনীর বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

মসজিদের সকল সাহাবী সেই কান্নার শব্দ শুনে হতবাক হয়ে যান এবং অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতেও শুরু করেন। রাসুল (সা.) মিম্বর থেকে নেমে এসে একজন মমতাময়ী পিতার মতো কাণ্ডটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করেন, ঠিক যেভাবে একটি ক্রন্দনরত শিশুকে শান্ত করা হয়। হাসান বসরি (র.) এই হাদিস বর্ণনা করে কাঁদতেন আর বলতেন, “হে মুসলিমরা! একটি শুষ্ক কাঠ যদি আল্লাহর রাসুলের প্রেমে কাঁদতে পারে, তবে তোমাদের হৃদয় তাঁর প্রতি ভালোবাসায় আরও বেশি ব্যাকুল হওয়া উচিত নয় কি?”¹⁵⁹

বৃক্ষ, পাথর ও প্রাণীর আনুগত্য:

রাসুল (সা.) মক্কার জীবন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেন,

“মক্কায় এমন একটি পাথর ছিল, যা নবুয়তের আগেও আমি যখন সে পথ দিয়ে যেতাম, তখন আমাকে সালাম দিত। আমি এখনও সেটিকে চিনি।”¹⁶⁰

এছাড়াও তাঁর নির্দেশে গাছপালা মাটি চিরে তাঁর কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং আবার নিজ স্থানে ফিরে গেছে। একটি অত্যাচারিত উট একবার ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে কান্না করেছিল এবং রাসুল (সা.) উটের মালিককে ডেকে এই অবলা প্রাণীর ওপর নির্যাতন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।

ঘ) জ্ঞান, ভবিষ্যদ্বাণী ও অদৃশ্য জগতের সংবাদ

নবুয়তের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ওহীর মাধ্যমে অদৃশ্য বা গায়েবের সংবাদ লাভ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় এমন বহু সংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন, যার প্রতিটি বর্ণে বর্ণে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী:

  • রোমানদের বিজয় (সূরা আর-রুম): যখন পারস্য সাম্রাজ্য রোমানদের (বাইজান্টাইন) চরমভাবে পরাজিত করে, তখন মক্কার কাফিররা উল্লাস করেছিল। তখন কুরআন ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, “আগামী কয়েক বছর (৩ থেকে ৯ বছর)-এর মধ্যেই রোমানরা আবার বিজয়ী হবে।” তৎকালীন পরাশক্তি পারস্যের কাছে রোমানদের সেই বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে এই ভবিষ্যদ্বাণী অসম্ভব মনে হলেও, ঠিক ৯ বছরের মাথায় রোমানরা পারস্যকে পরাজিত করে, যা ঐতিহাসিক সত্য।
  • মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান বিজয়: রাসুল (সা.) খন্দকের যুদ্ধের কঠিন সময়ে যখন সাহাবীরা ভয়ে কাঁপছিলেন, তখন পাথর ভাঙতে ভাঙতে পারস্যের শ্বেত প্রাসাদ, সিরিয়ার লাল প্রাসাদ এবং ইয়েমেনের চাবি তাঁর হস্তগত হওয়ার (অর্থাৎ ইসলামী সাম্রাজ্যের বিজয়ের) সুসংবাদ দেন, যা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেই সত্য প্রমাণিত হয়। কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহের হাতে বাস্তবায়িত হয়।¹⁶¹
  • উম্মতের অভ্যন্তরীণ সংকট ও সাহাবীদের পরিণতি: তিনি বলে গিয়েছিলেন যে তাঁর পর ৩০ বছর খেলাফত থাকবে, এরপর রাজতন্ত্র শুরু হবে (যা হুবহু সত্য হয়েছে)। তিনি উসমান (রা.)-কে এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে শাহাদাত বরণের সংবাদ দিয়েছিলেন। তিনি আম্মার বিন ইয়াসির (রা.)-কে বলেছিলেন, “তোমাকে একটি বিদ্রোহী দল হত্যা করবে,” যা সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর হাতে আম্মার (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়।

ঙ) আরোগ্য ও শারীরিক মু’জিযা

আরোগ্য দান (শিফা):

আধুনিক চিকিৎসার অভাবে সেই যুগে যুদ্ধাহত বা অসুস্থরা প্রায়ই মৃত্যুবরণ করত। কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসুলকে স্পর্শ ও লালার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শিফা বা আরোগ্য দানের এক অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছিলেন।

  • আলি (রা.)-এর চোখ: খায়বার যুদ্ধের সময় যখন সবচেয়ে শক্তিশালী কামুস দুর্গ জয় করার জন্য রাসুল (সা.) হজরত আলি (রা.)-কে খুঁজছিলেন, তখন জানা গেল আলির চোখে চরম প্রদাহ (সংক্রমণ), তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। রাসুল (সা.) তাঁকে ডেকে তাঁর দুই চোখে নিজের পবিত্র মুখের লালা লাগিয়ে দোয়া করে দেন। সাথে সাথে আলির চোখ এমনভাবে সুস্থ হয়ে যায়, যেন তাঁর কখনোই কোনো চোখের রোগ ছিল না।¹⁶²
  • কাতাদা (রা.)-এর চোখ স্থাপন: ওহুদের যুদ্ধে তীর বা বর্শার আঘাতে সাহাবী কাতাদা বিন নুমান (রা.)-এর একটি চোখ কোটর থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে তাঁর গালের ওপর ঝুলে পড়ে। সাহাবীরা চোখটি কেটে ফেলতে চাইলে রাসুল (সা.) নিষেধ করেন। তিনি চোখটি নিজ হাতে যথাস্থানে বসিয়ে দিয়ে দোয়া করে দেন। চোখটি শুধু জোড়াই লাগেনি, বরং তাঁর অন্য চোখের চেয়ে এই চোখটিই পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি সুন্দর ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।¹⁶³

চ) আল-কুরআন: সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরন্তন মু’জিযা

পূর্ববর্তী নবীদের মু’জিযাগুলো (যেমন মুসার লাঠি বা ঈসার মৃতকে জীবিত করা) ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং যারা তা স্বচক্ষে দেখেছিল, শুধু তাদের জন্যই প্রমাণস্বরূপ ছিল। নবীর মৃত্যুর সাথে সাথে সেই মু’জিযাও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আল-কুরআন হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী মু’জিযা, যা শুধু তাঁর যুগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল মানবজাতির জন্য এক জীবন্ত ও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।

এর অলৌকিকত্বের কয়েকটি দিক হলো:

  • ভাষাগত ও শৈলীগত অলৌকিকত্ব (Tahaddi): এমন এক যুগে, যখন আরবরা তাদের ভাষার অলংকার, সাহিত্য ও বাগ্মিতার জন্য সর্বোচ্চ গর্ব করত, তখন কুরআন তার অতুলনীয় ভাষা, শৈলী ও ছন্দের মাধ্যমে তাদের চ্যালেঞ্জ করে। প্রথমে ১০টি সূরা, এরপর অন্তত এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় (সূরা আল-বাকারাহ: ২৩)। আরবের শ্রেষ্ঠ কবি ও ভাষাবিদরা এই চ্যালেঞ্জের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। আজ ১৪০০ বছর পরও কেউ সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেনি।
  • বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব: মরুভূমির নিরক্ষর নবীর ওপর অবতীর্ণ এই গ্রন্থে ভ্রূণবিদ্যা (Embryology), মহাকাশবিজ্ঞান (Expanding Universe ও গ্রহ-নক্ষত্রের নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ), সমুদ্রবিজ্ঞান (লবণাক্ত ও মিঠা পানির মাঝে অদৃশ্য পর্দা) এবং ভূতত্ত্ব (পাহাড়কে পৃথিবীর পেরেক হিসেবে স্থাপন) সম্পর্কে এমন সব সূক্ষ্ম তথ্য রয়েছে, যা বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক আবিষ্কারের সাথে নিখুঁতভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
  • ঐতিহাসিক নির্ভুলতা: কুরআন পূর্ববর্তী জাতি (যেমন আদ, সামুদ) ও নবীদের (মুসা, ফেরাউন, ইউসুফ) এমন সব নিখুঁত ঐতিহাসিক বিবরণ প্রদান করে, যা তৎকালীন আরবে প্রচলিত বিকৃত কাহিনীগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত এবং আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার দ্বারা প্রমাণিত।
  • আইনগত ও সামাজিক পূর্ণাঙ্গতা: এটি কোনো মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত সংবিধান নয়, বরং এটি এমন এক পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিমুক্ত জীবনবিধান প্রণয়ন করে, যা মানবজীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সকল সমস্যার এক ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধান প্রদান করে, যা স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে সর্বদা সমাদৃত।

তথ্যসূত্র: পরিশিষ্ট-১: রাসুল সা. এর মু’জিযা

  • ¹⁵⁴ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৮৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮০০; আল-কুরআন, সূরা আল-কামার, ৫৪:১।
  • ¹⁵⁵ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২।
  • ¹⁵⁶ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৫৭২; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৭৯।
  • ¹⁵⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪১০২; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২০৩৯।
  • ¹⁵⁸ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ১০১৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৯৭।
  • ¹⁵⁹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৫৮৩।
  • ¹⁶⁰ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৭৭।
  • ¹⁶¹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩১৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯০০।
  • ¹⁶² সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৯৭৫, ৪২১০; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪০৬।
  • ¹⁶³ দালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী, ৩/৯৮।\

Ha-mim Zubaer