ত্রয়োদশ অধ্যায়: মক্কা বিজয় ও ক্ষমা (চূড়ান্ত বিজয়)
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করতে থাকে এবং আরবের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের অনুকূলে চলে আসে। এই চুক্তির ফলে শান্তির যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল, তা দলে দলে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে।
কুরাইশরা নিজেদের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা ও রাজনৈতিক একাকীত্ব গভীরভাবে অনুভব করতে থাকে। মদিনার ক্রমবর্ধমান শক্তির সামনে মক্কার শত বছরের অহংকার ম্লান হতে বসেছিল।
এমতাবস্থায়, তাদের পক্ষ থেকে এমন একটি মারাত্মক কৌশলগত ভুল সংঘটিত হয়, যা হুদায়বিয়ার শান্তি চুক্তিকে অকালে ভেঙে দেয়। আর এই নির্বুদ্ধিতাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে সত্যের পতাকা চূড়ান্তভাবে উত্তোলন করার ঐতিহাসিক সুযোগ করে দেয়।
১৩.১ চুক্তিভঙ্গ: মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট
হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুযায়ী, আরবের গোত্রগুলো মুসলিম বা কুরাইশ—যেকোনো পক্ষের সাথে মিত্রতার চুক্তি করার স্বাধীনতা লাভ করে। চুক্তি অনুসারে, বনু খুযা’আ গোত্র মুসলিমদের সাথে এবং তাদের দীর্ঘদিনের শত্রু বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে। এর ফলে উভয় গোত্রের জন্যই দশ বছরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল।
অষ্টম হিজরির শাবান মাসে, বনু বকর গোত্র ‘আল-ওয়াতির’ নামক জলাশয়ের ধারে বনু খুযা’আ গোত্রের ওপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিত হামলা চালায়। বনু খুযা’আর লোকেরা আত্মরক্ষার্থে মক্কার পবিত্র হারাম শরীফে (যেখানে রক্তপাত সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ) আশ্রয় নিলেও তাদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
কুরাইশরা এই আক্রমণে শুধু তাদের মিত্র বনু বকরকে অস্ত্র দিয়েই সাহায্য করেনি, বরং সাফওয়ান বিন উমাইয়া ও ইকরিমা বিন আবু জাহেলের মতো তাদের কিছু শীর্ষ নেতা পরিচয় গোপন করে রাতের আঁধারে সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। এটি ছিল হুদায়বিয়ার শান্তিপূর্ণ চুক্তির এক সুস্পষ্ট ও নির্লজ্জ লঙ্ঘন।
মদিনায় আরজি ও কুরাইশদের ব্যর্থ কূটনীতি:
বনু খুযা’আ গোত্রের নেতা আমর ইবনে সালিম ৪০ জন অশ্বারোহী নিয়ে দ্রুত মদিনায় ছুটে যান। তিনি মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দাঁড়িয়ে এক মর্মস্পর্শী কবিতার মাধ্যমে তাঁদের ওপর সংঘটিত অত্যাচার ও কুরাইশদের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিকার প্রার্থনা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সকরুণ আবেদন শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং দৃঢ়তার সাথে বলেন:
এই প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়েই মক্কা বিজয়ের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। এদিকে কুরাইশরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে চুক্তি নবায়নের জন্য আবু সুফিয়ানকে দ্রুত মদিনায় পাঠায়। কিন্তু আবু সুফিয়ান রাসুল (সা.), আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) এবং আলি (রা.)—সবার কাছে গিয়েও চুক্তি নবায়নে চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে।¹⁰⁴
১৩.২ প্রস্তুতি: গোপনীয়তা ও আল্লাহর ওপর আস্থা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল রক্তপাত এড়ানো। তিনি চেয়েছিলেন কুরাইশদেরকে অপ্রস্তুত অবস্থায় এমনভাবে হতবাক করে দিতে যেন তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং কাবা চত্বরের পবিত্রতা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না হয়।
চরম গোপনীয়তা ও হাতিব (রা.)-এর ঘটনা:
তিনি অভিযানের প্রস্তুতি ও যাত্রাপথ সম্পর্কে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যেন কুরাইশরা মুসলিমদের আগমনের খবর আগে থেকে না পায়। মদিনার চারপাশের পথগুলো কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখা হয়।
কিন্তু হাতিব ইবনে আবি বালতা’আ (রা.) নামক একজন বদরী সাহাবী, যাঁর পরিবার মক্কায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ছিল, তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে মক্কাবাসীর সহানুভূতি পাওয়ার আশায় মুসলিমদের অভিযানের খবর জানিয়ে গোপনে এক নারীর মাধ্যমে একটি পত্র প্রেরণ করেন।
আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-কে বিষয়টি জানিয়ে দেন। রাসুল (সা.) তাৎক্ষণিক আলি (রা.) ও মিকদাদ (রা.)-কে পাঠিয়ে ‘রওজাতুল খাক’ নামক স্থান থেকে পত্রটি উদ্ধার করেন। পত্রটি উদ্ধারের পর ওমর (রা.) চরম ক্ষুব্ধ হয়ে হাতিবের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
কিন্তু হাতিব (রা.) তাঁর অসহায়ত্বের কথা ও ঈমানের ওপর অটল থাকার কথা স্বীকার করলে রাসুল (সা.) তাঁর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করে বলেন:
এই অভাবনীয় ঘটনা রাসুল (সা.)-এর অতুলনীয় ক্ষমাশীলতা, দূরদর্শিতা ও বদরী সাহাবীদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার পরিচয় দেয়।¹⁰⁵
ঐতিহাসিক যাত্রা ও আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ:
দশম রমজান, অষ্টম হিজরিতে, দশ হাজার সাহাবীর এক বিশাল, সুসজ্জিত ও ঈমানদীপ্ত বাহিনী নিয়ে রাসুল (সা.) মক্কার দিকে যাত্রা করেন। মক্কার অদূরে ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করেন।
তিনি সেনাবাহিনীকে দশ হাজার পৃথক পৃথক আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দেন। রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় জ্বলতে থাকা দশ হাজার অগ্নিকুণ্ড দেখে মক্কাবাসী ও কুরাইশ নেতাদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বের হয়ে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান মুসলিম প্রহরীদের হাতে ধরা পড়েন এবং আব্বাস (রা.)-এর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর তাঁবুতে নীত হন। মুসলিমদের অপ্রতিরোধ্য শক্তি ও শৃঙ্খলা উপলব্ধি করে আবু সুফিয়ান অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু তাকে ক্ষমাই করেননি, বরং মক্কার এই অভিজাত নেতার মনস্তত্ত্ব বুঝে তাঁর সম্মান রক্ষার্থে এক ঐতিহাসিক সাধারণ ঘোষণা দেন:
১৩.৩ বিজয়: ক্ষমতার নয়, ক্ষমার প্রকাশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দশ হাজার সৈন্যের বিশাল সেনাবাহিনীকে চারটি দলে বিভক্ত করে খালিদ বিন ওয়ালিদ, জুবাইর ইবনুল আওয়াম, সাদ ইবনে উবাদাহ এবং আবু উবাইদা (রা.)-এর নেতৃত্বে চারটি ভিন্ন দিক থেকে মক্কায় প্রবেশের নির্দেশ দেন।
তিনি কঠোরভাবে আদেশ দেন:
খালিদের নেতৃত্বাধীন দলটির সাথে ইকরিমা বিন আবু জাহেলের বাহিনীর সামান্য সংঘর্ষ ছাড়া মক্কা বিজয় ছিল সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন।
রাসুল (সা.)-এর বিনয় ও কাবার পবিত্রতা পুনরুদ্ধার:
দশ হাজার সৈন্যের সর্বাধিনায়ক ও বিজয়ী সেনাপতি হিসেবে তিনি যখন তাঁর উটনী ‘কাসওয়া’-এর পিঠে চড়ে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁর মধ্যে কোনো বিজয়ীর অহংকার বা দম্ভ ছিল না। বরং আল্লাহর প্রতি পরম কৃতজ্ঞতায় তাঁর মাথা এতটাই নত ছিল যে, তাঁর দাড়ি উটের পিঠ স্পর্শ করছিল। তিনি অনবরত সূরা আল-ফাতহ তেলাওয়াত করছিলেন।
তিনি সরাসরি কাবা শরীফে যান, তাওয়াফ করেন এবং তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে কাবা চত্বরে স্থাপিত ৩৬০টি মূর্তিকে একে একে আঘাত করে ভূপাতিত করতে থাকেন আর কুরআনের সেই অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেন:
দীর্ঘ দুই দশকের শিরকের অন্ধকার দূর করে কাবা তার আদি পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর একত্ববাদের পবিত্রতায় ফিরে আসে।
বেলালের আযান: সাম্যের চূড়ান্ত ঘোষণা
এরপর তিনি তাঁর প্রিয় সাহাবী, সাবেক হাবশি দাস হজরত বিলাল (রা.)-কে কাবার ছাদে উঠে আযান দেওয়ার নির্দেশ দেন। যে মক্কায় একদিন বিলালকে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল, আজ সেই মক্কার সর্বোচ্চ সম্মানের স্থানে তিনি দণ্ডায়মান।
কুরাইশদের বর্ণবাদী অহংকারের প্রতীক কাবার ছাদ থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া আযানের সুর ছিল ইসলামের সাম্য ও মানবতার চূড়ান্ত ঘোষণা। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে বংশমর্যাদার কোনো স্থান নেই, মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।
১৩.৪ সাধারণ ক্ষমা: ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত
এরপর কাবা চত্বরে সমবেত হলো সেই কুরাইশরা, যারা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল। যারা তাঁকে মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়েছিল, তাঁর প্রিয়জনদের হত্যা করেছিল, আজ তারা সম্পূর্ণ পরাজিত, অসহায় ও ক্ষমাপ্রার্থী হিসেবে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান। আরবের যুদ্ধরীতি অনুযায়ী আজ তাদের সকলের শিরশ্ছেদ হওয়ার কথা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন:
ভয়ে কম্পমান কুরাইশরা উত্তর দিল, “আপনি একজন দয়ালু ভাই এবং এক দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। আমরা আপনার কাছে কেবল করুণাই প্রত্যাশা করি।” তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেন:
বিশ্লেষণ:
এই মহৎ ঘোষণার মাধ্যমে রাসুল (সা.) এমনকি হিন্দু বিনতে উতবা (যিনি হামজা রা.-এর কলিজা চিবিয়েছিলেন) এবং ইকরিমা বিন আবু জাহেলের মতো ঘোরতর শত্রুদেরও ক্ষমা করে দেন। মক্কা বিজয় ছিল অস্ত্রের বিজয় নয়, বরং ক্ষমার বিজয়।
এটি ছিল ‘ফাতহুল ইনতিকাম’ (প্রতিশোধের বিজয়)-এর পরিবর্তে ‘ফাতহুর রাহমাহ’ (দয়ার বিজয়)। এই সাধারণ ক্ষমা আরবের শত শত বছরের রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের বৃত্তকে চিরতরে ভেঙে দিয়ে এক নতুন, শান্তিপূর্ণ ও ক্ষমাশীল সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে, যা ইতিহাসে আজও অদ্বিতীয়।
১৩.৫ হুনাইনের যুদ্ধ: বিজয়ের পরের পরীক্ষা
মক্কা বিজয়ের সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে মক্কার পার্শ্ববর্তী হাওয়াজিন ও সাকিফ নামক দুটি দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী বেদুইন গোত্র ইসলামের এই উত্থানকে মেনে নিতে পারল না। তারা মনে করল, কুরাইশদের পতনের পর এবার তাদের পালা।
তাই তারা মালিক ইবনে আউফের নেতৃত্বে প্রায় বিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী একত্রিত করে। মালিক ইবনে আউফ এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করে—যোদ্ধাদের সাথে তাদের নারী, শিশু ও গবাদিপশুদেরও যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসে, যাতে কেউ পরিবার ফেলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে না পারে। তারা হুনাইন উপত্যকায় সমবেত হয়।¹⁰⁹
সংখ্যাধিক্যের গর্ব ও আকস্মিক বিপর্যয়:
মক্কা বিজয়ের মাত্র পনেরো দিন পর, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার দশ হাজার এবং মক্কার নতুন দুই হাজারসহ মোট ১২,০০০ সৈন্যের এক সুবিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের মোকাবেলা করতে যান। মুসলিমদের কেউ কেউ নিজেদের এই অভাবনীয় সংখ্যাধিক্য দেখে অহংকারবশত বলে ফেলেন:
এই আত্মম্ভরিতা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেননি। হুনাইনের সংকীর্ণ ও পাহাড় ঘেরা গিরিপথে ভোরবেলায় মুসলিম বাহিনী প্রবেশ করা মাত্রই পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা হাওয়াজিন গোত্রের তিরন্দাজরা বৃষ্টির মতো অতর্কিত তীর বর্ষণ শুরু করে। এই আকস্মিক হামলায় মুসলিম বাহিনীর সামনের সারিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং তারা পিছু হটতে শুরু করে।¹¹⁰
নবীর অটল দৃঢ়তা ও চূড়ান্ত বিজয়:
এই চরম বিপদের মুহূর্তে, যখন হাজার হাজার সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাদা খচ্চর ‘দুলদুল’-এর পিঠে বসে যুদ্ধক্ষেত্রে পাহাড়ের মতো অটল থাকেন। তিনি উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে থাকেন:
তিনি তাঁর চাচা আব্বাস (রা.)-কে, যাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত জোরালো, নির্দেশ দেন সাহাবীদের ডাকতে। আব্বাসের (রা.) ডাকে আনসার ও মুহাজির সাহাবীরা পুনরায় প্রবল বিক্রমে একত্রিত হন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন।
গনিমতের মাল বণ্টন ও আনসারদের প্রতি ভালোবাসা:
হুনাইনের যুদ্ধ এই শিক্ষা দেয় যে, বিজয় সৈন্যসংখ্যা বা অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না, বরং একমাত্র আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। সামান্য অহংকার বা আত্মম্ভরিতা আল্লাহর সাহায্য থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত করতে পারে।
এই যুদ্ধের পর ‘জি’রানা’ নামক স্থানে গনিমতের বিপুল সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) কুরাইশ ও বেদুইনদের নওমুসলিম নেতাদের হৃদয় জয় করার জন্য (‘তা’লিফে কুলুব’) অনেক বেশি অংশ প্রদান করেন। এতে কিছু তরুণ আনসার সাহাবীর মনে এই ভেবে কষ্ট জাগে যে, রাসুল (সা.) হয়তো তাঁর স্বজাতির প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন।
এই খবর শুনে রাসুল (সা.) আনসারদের একটি তাঁবুতে একত্রিত করে এক অত্যন্ত আবেগঘন ভাষণ দেন:
এই কথা শুনে আনসার সাহাবীরা এমনভাবে কেঁদে ফেলেন যে তাঁদের দাড়ি ভিজে যায়। এটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং আনসারদের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অমর দৃষ্টান্ত।¹¹¹
তথ্যসূত্র: ত্রয়োদশ অধ্যায়
- ¹⁰⁴ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৯৭-৪০১; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৩-৩৭৪।
- ¹⁰⁵ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩০৮১, ৪২৭৪; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৬-৩৭৭।
- ¹⁰⁶ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৪০৮-৪১৩; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৮-৩৮০।
- ¹⁰⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪২৮৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৮৩।
- ¹⁰⁸ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৪১৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৮৪-৩৮৫।
- ¹⁰⁹ আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৯৩-৩৯৪।
- ¹¹⁰ আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯:২৫; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৪৪৩-৪৪৬।
- ¹¹¹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪৩৩০; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৬-৪০৭।