রাসুলুল্লাহ সা. এর ভালোবাসা

ঊনবিংশ অধ্যায়: উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সা. এর ভালোবাসা

ঊনবিংশ অধ্যায়: উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সা. এর ভালোবাসা

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক মহান নেতা, সেনাপতি, দার্শনিক বা সমাজ সংস্কারকের আগমন ঘটেছে, যাঁদের সাথে তাঁদের অনুসারীদের সম্পর্ক ছিল মূলত ভক্তি, রাজনৈতিক আনুগত্য, বুদ্ধিভিত্তিক মুগ্ধতা বা জাগতিক স্বার্থকেন্দ্রিক। নেতার মৃত্যুর সাথে সাথেই সাধারণত সেই সম্পর্কের তীব্রতা সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যায়, এবং ধীরে ধীরে তা কেবল ইতিহাসের পাতায় বা স্মৃতিস্তম্ভে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর উম্মতের মধ্যকার সম্পর্ক শুধু একজন ঐতিহাসিক নেতা ও তাঁর অনুসারীদের মতো সাময়িক বা জাগতিক নয়; এটি এক জীবন্ত, চিরন্তন ও আধ্যাত্মিক বন্ধন, যা ঈমানের গভীরে প্রোথিত এবং মৃত্যু বা সময়ের সীমানা পেরিয়ে পরকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। চৌদ্দ শতাব্দীর ভৌগোলিক ও কালগত দূরত্ব এই সম্পর্ককে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি।

এই সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড় এবং পারস্পরিক—উম্মতের ওপর যেমন রাসুল (সা.)-এর কিছু অবশ্য পালনীয় অধিকার রয়েছে, তেমনি উম্মতের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও উদ্বেগ ছিল অতুলনীয়, যা একজন মমতাময়ী মায়ের তাঁর সন্তানের প্রতি ভালোবাসাকেও হার মানায়। আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে:

“নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী…” (সূরা আল-আহযাব: ৬)।

অর্থাৎ, একজন মুমিনের নিজের জান, মাল, কামনা-বাসনা ও মতামতের চেয়েও নবীর দাবি ও অধিকার তার কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। মুমিনের প্রতিটি নিঃশ্বাস ও বিশ্বাস এই পবিত্র সম্পর্কের কাছে দায়বদ্ধ।

১৯.১ উম্মতের ওপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অধিকার

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনার অর্থ শুধু তাঁকে ঐতিহাসিকভাবে একজন মহামানব বা নবী হিসেবে স্বীকার করাই নয়, বরং এই স্বীকৃতির সাথে কিছু অপরিহার্য ও ব্যবহারিক অধিকারও জড়িত, যা আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য আবশ্যক। এই অধিকারগুলো আদায় ছাড়া ঈমানের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ঈমান (বিশ্বাস):

তাঁর ওপর ঈমান আনা ইসলামের মূল ভিত্তি এবং কালিমায়ে শাহাদাহ্‌-এর দ্বিতীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ (‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ’)। এর অর্থ হলো, অত্যন্ত দৃঢ় ও নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করা যে তিনি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ ও সর্বশেষ রাসুল। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে সত্য।

আধুনিক বিজ্ঞান, সমসাময়িক দর্শন বা মানুষের সীমিত বুদ্ধির কাছে কোনো কিছু সাময়িকভাবে অবোধগম্য মনে হলেও, একজন মুমিন এই বিশ্বাসে অটল থাকেন যে, নবীর বাণী সকল জাগতিক যুক্তির ঊর্ধ্বে। তাঁর রিসালাতের পূর্ণাঙ্গতা এবং ‘খতমে নবুয়ত’ (তিনিই সর্বশেষ নবী, তাঁর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না)-এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। তাঁর আনীত দ্বীনকে জীবনের চূড়ান্ত ও একমাত্র সত্য হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত ঈমান।

ইত্তিবা (অনুসরণ):

তাঁর সুন্নাহ বা জীবন পদ্ধতিকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়—একমাত্র ও সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করাই হলো ‘ইত্তিবা’। শুধু মুখে ভালোবাসার দাবি করাই যথেষ্ট নয়; সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে রাসুলের অনুসরণকে নির্ধারণ করে ঘোষণা করেছেন:

“বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সূরা আলে ইমরান: ৩১)

সাহাবায়ে কেরাম তাঁর ইত্তিবা বা অনুসরণের এমন নজির স্থাপন করেছিলেন যে, তিনি কীভাবে হাঁটতেন, কীভাবে খেতেন, কীভাবে হাসতেন—তাঁরা অবিকল সেভাবে করার চেষ্টা করতেন। হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) শুধু এ কারণেই লাউ খেতে পছন্দ করতেন, কারণ তিনি রাসুল (সা.)-কে প্লেট থেকে খুঁজে খুঁজে লাউ খেতে দেখেছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সফরের পথে ঠিক সেই স্থানে উট থামাতেন বা বিশ্রাম নিতেন, যেখানে তিনি রাসুল (সা.)-কে বিশ্রাম নিতে দেখেছিলেন। এটি ছিল ভালোবাসাপূর্ণ অনুসরণের এক চরম পরাকাষ্ঠা।

তা’আত (আনুগত্য):

ইত্তিবা হলো তাঁর সাধারণ জীবনপদ্ধতির ঐচ্ছিক ও প্রেমময় অনুসরণ, আর তা’আত হলো তাঁর আদেশের সামনে নিঃশর্ত ও চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ। তিনি যেসকল আদেশ দিয়েছেন, তা পালন করা এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন, তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি যদি সেই আদেশের বিপরীতও চায়, তবুও নবীর আদেশকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো তা’আত।

মদিনায় যখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত নাজিল হলো এবং রাসুল (সা.)-এর ঘোষণাকারী মদিনার অলিতে গলিতে তা ঘোষণা করল, তখন সাহাবীরা গ্লাসে থাকা মদটুকুও মুখে দেননি; মদিনার রাস্তায় মদের নদী বয়ে গিয়েছিল। তাঁর আনুগত্যকে আল্লাহ নিজের আনুগত্যের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন:

“যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা: ৮০)।

তাঁর যেকোনো ফয়সালা বা সিদ্ধান্তকে অন্তরে কোনো প্রকার দ্বিধা, সংকোচ বা অসন্তোষ ছাড়াই মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত ঈমানের প্রমাণ।

মহব্বত (ভালোবাসা):

রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজের জীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং পৃথিবীর সকল কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা। এটি ঈমানের পূর্ণতার পূর্বশর্ত। একবার হজরত ওমর (রা.) রাসুল (সা.)-কে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমার নিজের প্রাণ ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে আপনি আমার কাছে বেশি প্রিয়।” রাসুল (সা.) বললেন, “না ওমর, যতক্ষণ না আমি তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় না হব, ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না।” ওমর (রা.) সাথে সাথে গভীরভাবে উপলব্ধি করে বললেন, “এখন আপনি আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়।” তখন রাসুল (সা.) বললেন:

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় হব।”¹⁴³

সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বুক পেতে দিয়ে তাঁকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষা করে এই ভালোবাসার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ওহুদের যুদ্ধে বনু দিনার গোত্রের এক নারী তাঁর স্বামী, ভাই ও পিতাকে হারানোর খবর শুনেও শুধু বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন?” যখন তিনি নবীজিকে নিজের চোখে নিরাপদ দেখলেন, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন: “আপনাকে নিরাপদ দেখার পর অন্য যেকোনো বিপদই আমার কাছে তুচ্ছ।”

দরুদ ও সালাম (সালাওয়াত):

তাঁর প্রতি ভালোবাসার একটি প্রাত্যহিক ও চিরস্থায়ী আমল হলো—যখনই তাঁর নাম উচ্চারিত হবে, লেখা হবে বা শোনা যাবে, তখনই তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম (যেমন: সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরণ করা। এটি মহাবিশ্বের এমন একটি অনন্য ইবাদত, যা স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর অসংখ্য ফেরেশতারাও প্রতিনিয়ত করে থাকেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি একটি সরাসরি নির্দেশ:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করো।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)।

হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করেন এবং তার দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। দরুদ পাঠ মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি বৃদ্ধি করে এবং কিয়ামতের দিন রাসুল (সা.)-এর সবচেয়ে নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

তাওকির (সম্মান):

তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবারের প্রতি (আহলে বাইত) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তাঁর হাদিস ও সুন্নাহর প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতে মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে, অন্যথায় তাদের সকল নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে।

মদিনার প্রখ্যাত আলেম ইমাম মালিক (র.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি এতটাই সম্মান প্রদর্শন করতেন যে, তিনি মদিনার পবিত্র মাটিতে কখনো জুতো পায়ে বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে চলতেন না। তিনি বলতেন, “যে মাটিতে আল্লাহর রাসুল শায়িত আছেন, সে মাটিকে ঘোড়ার খুর দিয়ে আঘাত করতে আমার লজ্জা হয়।” এমনকি তিনি যখন হাদিস পড়াতেন, তখন গোসল করে, উত্তম পোশাক ও সুগন্ধি মেখে অত্যন্ত আদবের সাথে বসতেন। কোনোভাবেই তাঁর শানে অমর্যাদাকর কোনো কথা, কাজ বা ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করাকে ইসলাম চরম ও অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

১৯.২ উম্মতের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা ও উদ্বেগ

উম্মতের ওপর যেমন রাসুল (সা.)-এর অধিকার রয়েছে, তেমনি উম্মতের জন্য তাঁর ভালোবাসা, দয়া ও উদ্বেগ ছিল এক অতলান্ত মহাসাগরের মতো। একজন পিতা যেমন তাঁর বিপথগামী সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন থাকেন, রাসুল (সা.) তাঁর অনাগত উম্মতের জন্য তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল উম্মতকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর এক নিরলস সংগ্রাম।

আজন্ম উম্মতের চিন্তা:

হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবীকে একটি ‘মুস্তাজাব’ বা বিশেষ নিশ্চিত দোয়া করার সুযোগ দিয়েছিলেন, যা আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন। ইতিহাস সাক্ষী, সকল নবীই তাঁদের সেই বিশেষ দোয়া দুনিয়াতেই নিজ নিজ উম্মতের জন্য বা নিজের জন্য ব্যবহার করে ফেলেছেন (যেমন নূহ আ.-এর দোয়ায় মহাপ্লাবন এসেছিল, মুসা আ.-এর দোয়ায় ফেরাউন ধ্বংস হয়েছিল, সুলাইমান আ. বিশাল রাজত্ব চেয়েছিলেন)। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর এই সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্রটি দুনিয়ায় নিজের চরম বিপদের দিনেও ব্যবহার করেননি। তায়েফে রক্তাক্ত হয়ে বা ওহুদের ময়দানে দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ার পরও তিনি সেই দোয়া কাজে লাগাননি। তিনি বলেন,

“আমি আমার সেই বিশেষ দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য জমা করে রেখেছি।”¹⁴⁴

এই একটি হাদিসই প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর উম্মতকে কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতেন। তিনি নিজের জাগতিক আরাম বা সুরক্ষার চেয়ে উম্মতের পরকালীন মুক্তিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

উম্মতের জন্য অশ্রু:

তিনি প্রায়ই রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদের সালাতে দাঁড়িয়ে উম্মতের মুক্তির জন্য অঝোরে কাঁদতেন, এমনকি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাঁর মোবারক পা ফুলে ফেটে যেত। একদিন তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর দোয়া সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন, যেখানে তাঁরা নিজ নিজ উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে সকরুণ আবেদন করেছিলেন। এই আয়াতগুলো পড়তে পড়তে উম্মতের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তাঁর হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তিনি অঝোরে কেঁদে ফেলেন এবং হাত তুলে প্রার্থনা করতে থাকেন,

“হে আল্লাহ! আমার উম্মত, আমার উম্মত!”

তাঁর এই ব্যাকুল কান্না দেখে আল্লাহ তাআলা জিবরাইল (আ.)-কে পাঠিয়ে তাঁকে এই সুসংবাদ দেন যে,

“আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করব এবং আপনাকে কষ্ট দেব না।”¹⁴⁵

রাসুলুল্লাহ সা. এর ভালোবাসা

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালোবাসা:

তিনি শুধু তাঁর সমসাময়িক সাহাবীদেরই ভালোবাসতেন না, বরং চৌদ্দশো বছর পর বা ভবিষ্যতে আগত উম্মতের জন্যও তাঁর মনে ছিল গভীর ভালোবাসা ও তীব্র ব্যাকুলতা। তিনি একবার মদিনার জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে সাহাবীদের মজলিসে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

“আমার বড় ইচ্ছা হয় আমার সেই ভাইদের দেখতে, যারা আমার পরে আসবে, আমাকে না দেখেই আমার ওপর ঈমান আনবে।”¹⁴⁶

সাহাবীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ভাই নই?” তিনি বললেন, “তোমরা তো আমার সাহাবী (সঙ্গী)। আমার ভাই হলো তারা, যারা আমাকে না দেখেই আমার প্রতি দৃঢ় ঈমান আনবে।” চৌদ্দ শতাব্দী পর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ মুমিনের জন্যও এই কথাটি এক পরম সান্ত্বনা ও আবেগের বিশাল উৎস।

শাফায়াতের অধিকার: ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ:

তাঁর ভালোবাসার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে মহিমান্বিত প্রকাশ ঘটবে কিয়ামতের কঠিন ময়দানে। হাশরের ময়দানে যখন সূর্য মাথার খুব কাছে থাকবে এবং মানুষ নিজের ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে, তখন অসহনীয় কষ্টে নিপতিত হয়ে সবাই আদম (আ.) থেকে শুরু করে নূহ, ইবরাহিম, মুসা ও ঈসা (আ.) পর্যন্ত সকল উলুল আযম নবীর কাছে গিয়ে শাফায়াত বা বিচারকাজ শুরু করার সুপারিশের জন্য আবেদন করবে। কিন্তু সেদিন আল্লাহর চরম ক্রোধ দেখে প্রতিটি নবীই ভীত হয়ে “নাফসি, নাফসি” (আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও) বলে অপারগতা প্রকাশ করবেন।

অবশেষে, চরম হতাশ হয়ে সকল মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছুটে আসবে। সেদিন সমগ্র মানবজাতির মধ্যে একমাত্র তিনিই শান্ত ও অবিচল কণ্ঠে বলবেন, “আনা লাহা” (আমিই এই সুপারিশের জন্য)। তখন তিনি আল্লাহর আরশের নিচে সিজদায় পড়ে এত দীর্ঘ সময় কাঁদতে থাকবেন যে আল্লাহ তাআলা দয়াপরবশ হয়ে বলবেন, “হে মুহাম্মদ! মাথা ওঠান, আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”

সেদিন তিনি নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য নয়, বরং বারবার “উম্মাতি, উম্মাতি” (আমার উম্মত, আমার উম্মত) বলে আল্লাহর কাছে তাঁর গোনাহগার উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। এটিই হলো ‘মাকামে মাহমুদ’ (প্রশংসিত স্থান), যা আল্লাহ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনিই হবেন ‘শাফিউল মুযনিবীন’ (পাপীদের সুপারিশকারী)।¹⁴⁷ তিনি হাউজে কাউসারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকবেন তাঁর উম্মতকে নিজ হাতে পানি পান করানোর জন্য, যাতে তারা বেহেশতে প্রবেশ করার আগে আর কখনো তৃষ্ণার্ত না হয়।

উপসংহার:

রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর উম্মতের মধ্যেকার এই সম্পর্ক এক জীবন্ত, স্পন্দিত ও সক্রিয় বন্ধন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য কোনো মৃত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি বছরে একদিন শ্রদ্ধা জানানো বা জন্মবার্ষিকী পালন করা মাত্র নয়, বরং এটি এমন এক প্রাত্যহিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ যা একজন মুমিনের জীবনকে প্রতিটি পদক্ষেপে অর্থবহ করে তোলে। তাঁর সুন্নাহর নিঃশর্ত অনুসরণ, তাঁর প্রতি প্রতিনিয়ত দরুদ প্রেরণ এবং তাঁর মহান আদর্শকে নিজের ব্যক্তিগত, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমেই এই সম্পর্ক সজীব থাকে। একমাত্র এই ভালোবাসার বন্ধন অটুট রাখলেই একজন উম্মত কিয়ামতের দিন তাঁর হাত থেকে ‘হাওজে কাউসার’-এর পানি পান করার এবং তাঁর কাঙ্ক্ষিত শাফায়াত বা সুপারিশ লাভের যোগ্য হতে পারবে।

তথ্যসূত্র: ঊনবিংশ অধ্যায়

  • ¹⁴³ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ১৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪।
  • ¹⁴⁴ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯৯।
  • ¹⁴⁵ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২০২।
  • ¹⁴⁶ মুসনাদে আহমাদ, ৩/১৫০; হাদিসটি সহীহ।
  • ¹⁴⁷ আল-কুরআন, সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:৭৯; শাফায়াতের বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪৭১২ এবং অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে রয়েছে।

Ha-mim Zubaer