রাসুল সা এর বংশ পরিচয় ও জন্ম

প্রথম অধ্যায়: রাসুল সা. এর বংশ পরিচয় ও জন্ম

প্রথম অধ্যায়: বংশ পরিচয় ও জন্ম

১.১ রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র বংশধারা: এক সোনালী ধারাবাহিকতা

“আল্লাহ তাআলা ইবরাহিমের সন্তানদের মধ্য থেকে ইসমাইলকে নির্বাচন করেছেন, ইসমাইলের সন্তানদের মধ্য থেকে বনি কিনানাকে, বনি কিনানার মধ্য থেকে কুরাইশকে এবং কুরাইশের মধ্য থেকে বনি হাশিমকে নির্বাচন করেছেন। আর বনি হাশিমের মধ্য থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন।”¹ (সহীহ মুসলিম)

রাসুল সা. এর বংশ পরিচয় ও জন্ম সম্পর্কে তাঁর এর এই হাদিসটি তাঁর বংশীয় আভিজাত্য এবং পবিত্রতার এক সুস্পষ্ট ঘোষণা। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘ ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ, যা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য শ্রেষ্ঠতম বংশধারার নির্বাচনকে নির্দেশ করে।

তাঁর বংশলতিকা হলো: মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব…

এই বংশধারা আদনান হয়ে হজরত ইসমাইল (আ.) ও হজরত ইবরাহিম (আ.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই বংশের প্রতিটি পুরুষ ছিলেন তাঁদের সময়ের নেতা, সমাজের স্তম্ভ এবং আল্লাহর ঘরের খাদেম।²

কুসাই ইবনে কিলাব: মক্কার প্রতিষ্ঠাতা ও কুরাইশের ঐক্যের প্রতীক

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কুসাই ছিলেন এক অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর আগে কুরাইশ গোত্র মক্কার আশপাশে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করত। কুসাই সর্বপ্রথম কুরাইশদের একত্রিত করে মক্কার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং একটি নগর-রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন।

তিনি কাবা ঘরের পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন এবং হাজিদের সেবা করার জন্য বিভিন্ন পদ প্রতিষ্ঠা করেন, যেমন—সিফারা (রাষ্ট্রদূত), লওয়া (পতাকা উত্তোলন), রিফাদা (হাজিদের আপ্যায়ন), সিকায়া (পানি সরবরাহ) এবং হিজাবা (কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ)।

তিনি “দারুন নাদওয়া” বা “মন্ত্রণাসভা” প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল কুরাইশদের সংসদ। এখানেই গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কুসাইয়ের এই দূরদর্শী নেতৃত্ব কুরাইশদের আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সম্মানিত গোত্রে পরিণত করে।³

হাশিম ইবনে আবদে মানাফ: বাণিজ্য ও মানবসেবার অগ্রদূত:

কুসাইয়ের পর তাঁর পৌত্র হাশিম বংশের নেতৃত্ব ও সম্মানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ব্যবসায়ী এবং উদার মনের মানুষ। তিনিই সর্বপ্রথম কুরাইশদের জন্য দুটি প্রধান বাণিজ্য যাত্রা—গ্রীষ্মকালে সিরিয়া এবং শীতকালে ইয়েমেনে—প্রবর্তন করেন, যা পবিত্র কুরআনের সূরা কুরাইশে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বাণিজ্য মক্কাকে এক সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করে। একবার মক্কায় তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে হাশিম সিরিয়া থেকে খাদ্যশস্য এনে রুটি তৈরি করে ঝোলের মধ্যে টুকরো টুকরো করে (আরবীতে ‘হাশামা’) দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন।

এই মহানুভবতার জন্যই তাঁর নাম হয় “হাশিম”। তাঁর এই মানবসেবা বনু হাশিম গোত্রকে এক বিশেষ মর্যাদায় আসীন করে।⁴

আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম: জমজমের পুনঃআবিষ্কারক ও কাবার রক্ষক:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তাঁর সময়ের কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর জীবনের দুটি ঘটনা তাঁকে কিংবদন্তিতুল্য সম্মানের অধিকারী করে।

প্রথমত, তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপ পুনঃখনন করেন, যা ছিল মক্কাবাসীর জন্য আল্লাহর এক বিশেষ রহমত।

দ্বিতীয়ত, তিনি আবরাহার হস্তিবাহিনীর আক্রমণের সময় অসাধারণ নেতৃত্ব ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা প্রদর্শন করেন। আবরাহা যখন তাঁর উটগুলো লুট করে, তখন তিনি নির্ভীকভাবে তার মুখোমুখি হয়ে বলেন,

তাঁর এই ঈমানদীপ্ত উত্তর আল্লাহর ওপর তাঁর গভীর আস্থার পরিচায়ক। এই দুটি ঘটনা তাঁকে সমগ্র আরবে এক কিংবদন্তী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।⁵

বিশ্লেষণ:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বংশধারা প্রমাণ করে যে তিনি কোনো সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁর পূর্বপুরুষরা বংশপরম্পরায় নেতৃত্ব, মানবসেবা, কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং একত্ববাদের ধারক ছিলেন।

এই পবিত্র ও সম্মানিত বংশে তাঁর আগমন ছিল নবুয়তের মতো মহান দায়িত্বের জন্য একটি নিখুঁত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, যা প্রমাণ করে যে তিনি কোনো ক্ষমতা বা সম্মানের কাঙাল ছিলেন না, বরং সম্মান ও নেতৃত্ব ছিল তাঁর বংশগত উত্তরাধিকার

১.২ আরব সমাজের প্রথা ও ঐতিহ্য: জাহেলিয়াতের গভীর অন্ধকার

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের পূর্ববর্তী যুগকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা ‘অজ্ঞতার যুগ’ বলা হয়। এই অজ্ঞতা ছিল মূলত আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের। যদিও আরবরা কাব্য, বাগ্মিতা ও স্মৃতিশক্তিতে বিশ্বে অদ্বিতীয় ছিল, তাদের সমাজব্যবস্থা ছিল চরম অবক্ষয়গ্রস্ত।⁶

ধর্মীয় বিশ্বাস ও অধঃপতন:

আরবরা নিজেদের হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী বলে দাবি করলেও তারা একত্ববাদের মূল শিক্ষা থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছিল। আমর ইবনে লুহাই নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম সিরিয়া থেকে মূর্তি এনে কাবায় স্থাপন করে এবং এভাবেই আরবে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটায়।

কাবা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে হুবাল, লাত, মানাত ও উজ্জা ছিল প্রধান। তারা বিশ্বাস করত, এই মূর্তিগুলো আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। এর পাশাপাশি তারা ভাগ্য নির্ধারক তীর, জ্যোতিষশাস্ত্র, অশুভ লক্ষণ এবং জিন-ফেরেশতাদের পূজা করত।

তবে এই ঘোর শিরকের মধ্যেও কিছু চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন, যাঁরা মূর্তিপূজা থেকে বিরত থেকে এক আল্লাহর সন্ধান করতেন; তাঁরা ‘হানিফ’ (একনিষ্ঠ) নামে পরিচিত ছিলেন, যেমন—ওয়ারাকা বিন নওফেল, জায়েদ ইবনে আমর প্রমুখ।⁷

গোত্রপ্রীতি ও সামাজিক কাঠামো:

‘আসাবিয়াহ’ বা গোত্রীয় সংহতি ছিল জাহেলি সমাজের মূল চালিকাশক্তি। গোত্রের সম্মান রক্ষার জন্য তারা যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিল। এর একটি ভালো দিক ছিল গোত্রের সদস্যদের নিরাপত্তা প্রদান করা, কিন্তু এর মন্দ দিক ছিল ভয়াবহ।

— এই নীতির ওপর ভিত্তি করে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোত্রগুলোর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত, যা ‘আইয়ামুল আরব’ (আরবদের যুদ্ধসমূহ) নামে পরিচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কৈশোরে সংঘটিত ‘হারবুল ফিজার’ (অন্যায় যুদ্ধ) এর একটি উদাহরণ।

সমাজ তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল: অভিজাত, সাধারণ আরব ও দাস। দাসদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ, তাদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না।

নৈতিক অবক্ষয় ও নারীর অবস্থান:

সমাজে নৈতিকতার কোনো সুস্পষ্ট মানদণ্ড ছিল না। মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার এবং অনাচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নারীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তাদের কোনো সামাজিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার ছিল না, তাদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো।

কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জাজনক মনে করা হতো এবং ‘ওয়াদুল বানাত’ অর্থাৎ কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নৃশংস প্রথাও আরবের কিছু গোত্রে প্রচলিত ছিল।

কিছু ইতিবাচক দিক:

এই গভীর অন্ধকারের মধ্যেও আরবদের কিছু প্রশংসনীয় গুণ ছিল। তারা ছিল প্রচণ্ড অতিথিপরায়ণ, সাহসী, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অটল এবং কাব্য ও সাহিত্যে ছিল তাদের অসাধারণ দক্ষতা। তাদের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

ইসলাম এই ইতিবাচক গুণগুলোকে আরও সুন্দর ও পরিমার্জিত করেছে এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করেছে।

১.৩ মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও শৈশব: অলৌকিক পূর্বাভাস

হস্তিবর্ষের ঘটনা ও তার তাৎপর্য:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের বছরেই ‘আমুল ফিল’ বা ‘হস্তিবর্ষের’ ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের খ্রিস্টান শাসক আবরাহা কাবা ধ্বংস করার জন্য এক বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান চালায়। তার উদ্দেশ্য ছিল আরবের কেন্দ্র মক্কা থেকে সরিয়ে সানায় নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবাবিল পাখির মাধ্যমে পাথর বর্ষণ করে তার পুরো বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন, যা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফিলে বর্ণিত হয়েছে।⁸

বিশ্লেষণ:

এই অলৌকিক ঘটনাটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন। এটি প্রমাণ করে যে এই শহর ও এই ঘর এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের ঠিক আগে এই ঘটনা ঘটার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিশ্বকে এই বার্তা দিয়েছিলেন যে, এমন এক মহামানবের আগমন ঘটতে চলেছে, যাঁর সম্মান রক্ষার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। এই ঘটনা কুরাইশদের মর্যাদা আরবে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

শুভ জন্ম ও বরকতময় শৈশব:

হস্তিবর্ষের সেই ঐতিহাসিক বছরেই, রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার প্রত্যুষে, মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় বিবি আমিনা এক নূর বা আলো দেখতে পান, যা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহকে আলোকিত করে দেয়। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহারা হন।

তৎকালীন আরবের রীতি অনুযায়ী,তাঁকে মরুভূমির মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য বনি সাদ গোত্রের বিবি হালিমার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিবি হালিমার পরিবারে তাঁর আগমনের সাথে সাথে অভাবনীয় বরকত নাজিল হতে শুরু করে। তাদের শুকিয়ে যাওয়া মেষের পাল দুধে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং দুর্বল বাহনটি কাফেলার সবচেয়ে দ্রুতগামী বাহনে পরিণত হয়।⁹

বক্ষ বিদারণের ঘটনা (শাক্কুস সদর):

বিবি হালিমার কাছে থাকাকালীন চার বছর বয়সে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। একদিন খেলারত অবস্থায় হজরত জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) মানুষের রূপে এসে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করেন, হৃৎপিণ্ড (কলব) বের করে তা থেকে একটি কালো অংশ ফেলে দেন এবং বলেন,

এরপর তা জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দেন।¹⁰

বিশ্লেষণ:

এই ঘটনাটি ছিল নবুয়তের জন্য তাঁকে আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত করার প্রথম ধাপ। এটি ছিল তাঁর ভেতর থেকে মানবীয় দুর্বলতা, পাপের প্রতি আকর্ষণ এবং শয়তানি প্ররোচনার সম্ভাবনাকে নির্মূল করে তাঁকে নিষ্পাপ (মাসুম) হিসেবে গড়ে তোলার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া, যাতে তিনি নিষ্কলুষভাবে ওহী ধারণ করতে পারেন।

১.৪ পারিবারিক জীবন: স্নেহ ও আশ্রয়ের ছায়াতলে

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শৈশব ছিল স্নেহ-মমতায় পূর্ণ, কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং একের পর এক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে,যা তাঁকে অল্প বয়সেই পরিণত ও সহনশীল করে তোলে।

মাতা আমিনার স্নেহ ও বিচ্ছেদ:

পাঁচ বছর মরুভূমিতে কাটিয়ে তিনি মা আমিনার কোলে ফিরে আসেন। ছয় বছর বয়সে মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় তাঁর আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যান। মক্কা ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে বিবি আমিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

মায়ের স্নেহময় কোল হারিয়ে ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.) সম্পূর্ণ ইয়াতিম হয়ে পড়েন। এই ঘটনা তাঁর কোমল হৃদয়ে এক গভীর ছাপ ফেলে এবং ইয়াতিম ও অসহায়দের প্রতি তাঁর মনে আজীবন এক বিশেষ সহানুভূতি তৈরি করে।¹¹

দাদা আবদুল মুত্তালিবের অকৃত্রিম ভালোবাসা:

মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর লালন-পালনের ভার নেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। তিনি তাঁর এই ইয়াতিম নাতিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কাবা চত্বরে তাঁর জন্য একটি বিশেষ আসন ছিল, যেখানে তাঁর পুত্ররাও বসার সাহস করতেন না।

কিন্তু তিনি ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-কে সেই আসনে নিজের পাশে বসাতেন এবং তাঁর মাথায় ও পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতেন। কিন্তু এই আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স যখন আট বছর,তখন তাঁর দাদাও ইন্তেকাল করেন।¹²

চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধান:

দাদার মৃত্যুর পর তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আবু তালিব অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল না হলেও ভাতিজার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। তিনি নিজের সন্তানদের চেয়েও মুহাম্মদ (সা.)-কে বেশি ভালোবাসতেন এবং সবসময় তাঁকে নিজের সাথে রাখতেন।

বারো বছর বয়সে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্য যাত্রায় যান। এই যাত্রাপথেই ‘বুহাইরা’ নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রী মুহাম্মদ (সা.)-কে দেখে তাঁর মধ্যে শেষ নবীর লক্ষণগুলো চিনতে পারেন এবং আবু তালিবকে তাঁর বিশেষ যত্ন নেওয়ার এবং ইহুদিদের থেকে সাবধানে রাখার পরামর্শ দেন। আবু তালিব আমৃত্যু কাফিরদের সমস্ত অত্যাচার ও চাপের মুখেও মুহাম্মদ (সা.)-কে রক্ষা করেছেন।¹³

বিশ্লেষণ:

শৈশবে একের পর এক নিকটাত্মীয়কে হারানোর মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়, সহনশীল এবং জাগতিক সহায়তার পরিবর্তে একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হতে শিখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

এই নিয়ন্ত্রিত প্রতিপালনই তাঁকে ভবিষ্যতে এক অতুলনীয় নেতা ও মানবদরদী মহামানব হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

তথ্যসূত্র: প্রথম অধ্যায়: রাসুল সা. এর বংশ পরিচয় ও জন্ম

  • ¹ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৭৬; তিরমিযী।
  • ² সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৫৩-৫৫; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১।
  • ³ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১২৪-১৩৬; শিবলী নোমানী, সিরাতুন্নবী (সা.), ১/১১৮-১১৯।
  • ⁴ ইবনে সা’দ, কিতাবুত তাবাকাত আল-কবীর, ১/৭৬-৭৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৫৬।
  • ⁵ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১৫৬-১৬৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৫৮-৬২।
  • ⁶ আবুল হাসান আলী নদভী, নবীয়ে রহমত, অধ্যায়: ‘আরব-জাহেলিয়াতের সার্বিক চিত্র’।
  • ⁷ সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০-৫২; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/২২২-২৩২।
  • ⁸ ইবনে কাসির, তাফসির আল-কুরআন আল-আযিম (সূরা আল-ফিলের তাফসির); ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪৩-৫৭।
  • ⁹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১৬৯-১৭৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৬৪-৬৫।
  • ¹⁰ সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬২; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১৭৫।
  • ¹¹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১৭৭; ইবনে সা’দ, কিতাবুত তাবাকাত আল-কবীর, ১/১১৬-১১৭।
  • ¹² আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৬৭।
  • ¹³ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/১৯১-১৯৪; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৬৮-৬৯।
    Ha-mim Zubaer