ইতিহাস কী ও কেন? পর্ব ১ – প্রারম্ভিকা: শেকড়ের সন্ধানে এবং ইতিহাস ‘কী’?

Islamic History

১. প্রারম্ভিকা: শেকড়ের সন্ধানে (In Search of Roots)

জামিয়াতুস সাহাবাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-এর ‘উচ্চতর সিরাত ও ইতিহাস অধ্যয়ন’ কোর্সের সম্মানিত তালিবে ইলম ভাইয়েরা,

আজ আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে আমাদের জ্ঞানান্বেষণের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি, যা ছাড়া আমাদের পুরো জীবনের পড়াশোনা, আমাদের দ্বীনি বোঝাপড়া এবং আমাদের ভবিষ্যৎ দেখবার দৃষ্টিই অপূর্ণ থেকে যাবে। আজ আমরা জানব ‘ইতিহাস পড়ার দর্শন’ (Philosophy of History) সম্পর্কে। ইতিহাস শুধু অতীত নয়; ইতিহাস হলো ভবিষ্যতের রাজপথ।

সাধারণত ‘ইতিহাস’ বা ‘তারিখ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটি গতানুগতিক দৃশ্য ভেসে ওঠে—যেন এটি রাজা-বাদশাহদের বিশাল রাজপ্রাসাদের গল্প, কবে কোন প্রান্তে কার সাথে যুদ্ধ হয়েছিল, কে কবে সিংহাসনে বসেছিল আর কবে মারা গিয়েছিল, সেসব নিরস সাল-তারিখ মুখস্থ করার একটি একঘেয়ে বিষয়। কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, ইতিহাসের এই ধারণাটি অত্যন্ত অগভীর এবং সম্পূর্ণ ভুল!

ইতিহাস কোনো মৃত মানুষের গল্প নয়; ইতিহাস হলো একটি জাতির শেকড় (Roots)। এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যা বর্তমানকে দিকনির্দেশনা দেয়।

একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন একটি বিশাল মহীরুহের কথা। বাইরে থেকে গাছটির ডালপালা বা পাতা যতই শক্তিশালী ও সতেজ মনে হোক না কেন, তার শেকড় যদি মাটির গভীরে শক্তভাবে প্রোথিত না থাকে, তবে সামান্য কালবৈশাখী ঝড়েই সেই বিশাল গাছ শিকড়সমেত উপড়ে পড়ে। ঠিক তেমনি, কোনো জাতির অর্থনীতি, সমরশক্তি বা প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, তারা যদি নিজেদের অতীত ও ইতিহাস ভুলে যায়, তবে ‘আদর্শিক আগ্রাসনে’ (Ideological Aggression) সেই জাতি খুব দ্রুত পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শেকড় কেটে দিলে যেমন পাতাগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে, ইতিহাস ভুলে যাওয়া একটি জাতিও ঠিক সেভাবেই আত্মপরিচয়হীন হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে।

মুহাম্মাদ কুতুবের ইতিহাস দর্শন ও আল-গাযউ আল-ফিকরি (বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন): আধুনিক যুগে মুসলিম উম্মাহর এই পরিচয় সংকট নিয়ে বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক উস্তাদ মুহাম্মাদ কুতুব (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘কাইফা নাক্তুবুত তারিখ আল-ইসলামি’ (كيف نكتب التاريخ الإسلامي)-এর ভূমিকায় অত্যন্ত চমৎকার এবং চোখ খুলে দেওয়া একটি কথা বলেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন যে, আধুনিক পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের ওপর সামরিক বা ভৌগোলিক আগ্রাসনের চেয়েও ভয়ংকর যে আগ্রাসনটি চালিয়েছে, তার নাম হলো ‘আল-গাযউ আল-ফিকরি’ (الغزو الفكري) বা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন। সামরিক পরাজয় একটি জাতিকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয় একটি জাতিকে চিরস্থায়ী দাসে পরিণত করে।

তিনি বলেন:

“পশ্চিমা ক্রুসেডাররা বুঝতে পেরেছিল যে, মুসলমানদের সামরিকভাবে পরাস্ত করা গেলেও তাদের আত্মাকে পরাস্ত করা যায় না, যতক্ষণ না তাদের ইতিহাস থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা যায়। তাই তারা অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। তারা আমাদের সোনালি যুগকে ‘অন্ধকার যুগ’ বলে প্রচার করেছে এবং আমাদের হিরোদের ভিলেন হিসেবে চিত্রিত করেছে, যাতে আমরা আমাদের শেকড় ভুলে গিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি এবং স্বেচ্ছায় তাদের মানসিক দাসে পরিণত হই।” (তথ্যসূত্র: মুহাম্মাদ কুতুব, ‘কাইফা নাক্তুবুত তারিখ আল-ইসলামি’, দারুশ শুরুক প্রকাশনী,)

লক্ষ্য নির্ধারণ: তাই আমাদের আজকের এই ফাউন্ডেশন ক্লাসের মূল উদ্দেশ্য হলো— ইতিহাসকে নিছক কোনো ‘গল্প’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিনোদন (Intellectual Entertainment) হিসেবে না দেখে, একে একটি ‘সমাজবিজ্ঞান’ (Sociology) এবং আমাদের ‘ঈমানি প্রেরণার প্রধান উৎস’ হিসেবে দেখতে শেখা। আমরা শিখব কীভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে নিজেদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার অনুপ্রেরণা খুঁজতে হয়।

২. ইতিহাস ‘কী’? (প্রারম্ভিক আলোচনা)

তালিবে ইলম ভাইয়েরা, এবার আমরা একটি গভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রবেশ করব। ইতিহাস বা আরবি ‘তারিখ’ (تاريخ) আসলে কী? আমাদের পূর্বসূরি ইসলামি পণ্ডিতগণ ইতিহাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন?

  • ক. আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা (আল্লামা সাখাবীর দৃষ্টিকোণ): ‘তারিখ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো ঘটনার সময় নির্ধারণ করা (الإعلام بالوقت)। কিন্তু পারিভাষিক অর্থে ইতিহাস কী, তার শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা দিয়েছেন নবম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক হাফেজ শামসুদ্দীন আস-সাখাবী (রহ.) (মৃ. ৯০২ হি.)

তৎকালীন সমাজে কিছু মানুষ ইতিহাস চর্চাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করত। তারা ভাবত, মৃত মানুষের গল্প শুনে আখেরাতের কী ফায়দা? তাদের এই অজ্ঞতার জবাব দিতে গিয়ে আল্লামা সাখাবী (রহ.) একটি কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম ‘আল-ইলান বিত-তাওবিখ লিমান যাম্মা আহলাত-তাওরিখ’ (الإعلان بالتوبيخ لمن ذم أهل التوريخ) (অর্থাৎ, যারা ঐতিহাসিকদের নিন্দা করে তাদের প্রতি ভর্ৎসনামূলক ঘোষণা)। এই কিতাবে তিনি ইতিহাসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন:

فالتاريخ فن يبحث عن وقائع الزمان من حيث التعيين والتوقيت، وموضوعه: الإنسان والزمان…” “ইতিহাস হলো এমন এক শাস্ত্র, যা সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে নির্দিষ্টকরণ ও সময় নির্ধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করে। আর এর মূল আলোচ্য বিষয় হলো দুটি: মানুষ এবং সময় (الإنسان والزمان)।” (তথ্যসূত্র: আল-ইলান বিত-তাওবিখ, দারুস সামিয়ী প্রকাশনী, তাহকিক: সালেম আল-যাফিরি,)

আল্লামা সাখাবী (রহ.) অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ইতিহাস কোনো বাতিল বা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যা নয়; বরং ইতিহাস ছাড়া দ্বীনের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। কারণ, ইতিহাস ছাড়া হাদিসের সনদ যাচাই করা বা ‘ইলমুল রিযাল’ (বর্ণনাকারীদের জীবনী বিজ্ঞান) প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কোন রাবি (বর্ণনাকারী) কখন জন্মেছেন, কার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তিনি সত্যবাদী ছিলেন নাকি মিথ্যুক—এই সবকিছু জানার একমাত্র উপায় হলো ইতিহাস। সুতরাং, ইতিহাস চর্চা উম্মাহর অতীত ঐতিহ্য এবং দ্বীন সংরক্ষণের জন্য একটি ফরজ দায়িত্বের সমতুল্য।

Facebook
Twitter
LinkedIn

Leave a Comment