মক্কায় দাওয়াত ও বিরোধিতা

চতুর্থ অধ্যায়: মক্কায় দাওয়াত ও বিরোধিতা

চতুর্থ অধ্যায়: মক্কায় দাওয়াত ও বিরোধিতা

নবুয়ত লাভের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এক নতুন ও সংগ্রামমুখর অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এই অধ্যায়টি ছিল সত্যের আহ্বান এবং মিথ্যার প্রতিরোধের এক মহাকাব্য।

মক্কায় তাঁর দাওয়াতের কৌশল ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং পর্যায়ক্রমিক, যা পরিস্থিতি ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার আলোকে নির্ধারিত হয়েছিল।

৪.১ প্রথম পর্যায়: তিন বছরের গোপন দাওয়াত

ওহী লাভের পর প্রাথমিক দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল (সা.)-কে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দাওয়াতের নির্দেশ দেন। কুরাইশদের জাহেলি সমাজের গোঁড়ামি, উগ্রতা এবং শিরকের প্রতি তাদের অন্ধ আনুগত্য সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন।

তাই প্রকাশ্যে দাওয়াত দিলে যে সংঘাত অনিবার্য, তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। এই সময়ে তিনি কেবল তাঁর নিকটতম, বিশ্বস্ত এবং সত্য অনুসন্ধানী মানুষদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেন।

দাওয়াতের কেন্দ্র দারুল আরকাম:

এই গোপন দাওয়াতের প্রধান কেন্দ্র ছিল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সাহাবী আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়ি (দারুল আরকাম)। এই বাড়িটি ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে এবং কুরাইশ নেতাদের নাগালের বাইরে।

এখানেই রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন মুসলিমদের সাথে মিলিত হতেন, তাদের কুরআনের আয়াত শেখাতেন এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা ও নৈতিকতার ওপর ‘তারবিয়াহ’ বা প্রশিক্ষণ দিতেন।

এই পর্বের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একদল নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শবান মানুষ তৈরি করা, যাঁরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে ভবিষ্যতের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবেন। এই সময়েই হজরত আম্মার, হজরত খুবাইব, হজরত বিলাল (রা.)-এর মতো অনেক সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেন।²⁹

বিশ্লেষণ:

এই তিন বছরের গোপন দাওয়াত ছিল ইসলামের জন্য একটি কৌশলগত ও অপরিহার্য পদক্ষেপ। এটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে ইসলাম পরবর্তীতে প্রকাশ্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।

এই পর্যায়টি শিক্ষা দেয় যে, যেকোনো বড় সামাজিক বা আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য তাড়াহুড়ো নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ও প্রশিক্ষিত কোর (core) বা কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করা আবশ্যক।

৪.২ দ্বিতীয় পর্যায়: প্রকাশ্যে দাওয়াতের সূচনা

তিন বছর পর, যখন মুসলিমদের একটি ছোট কিন্তু দৃঢ় দল তৈরি হলো, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ এলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,

এবং

নিকটাত্মীয়দের প্রতি দাওয়াত:

প্রথমত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু হাশিম গোত্রের প্রায় ৪৫ জন ব্যক্তিকে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান। আহার শেষে তিনি যখন ইসলামের কথা বলতে উদ্যত হন, তখন তাঁর চাচা আবু লাহাব বাধা দিয়ে মজলিস ভেঙে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বিতীয়বার তাদের আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন,

তখন উপস্থিত সকলেই নীরব থাকলেও, কিশোর আলি (রা.) উঠে দাঁড়িয়ে সাহসিকতার সাথে বলেন,

সাফা পাহাড়ের ঐতিহাসিক ঘোষণা:

এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কুরাইশদের সকল গোত্রকে একত্রিত করেন। যখন সকলে সমবেত হলো, তিনি তাঁর সত্যবাদিতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দেন এবং উপস্থিত জনতাকে জিজ্ঞেস করেন, তারা তাঁকে বিশ্বাস করে কি না।

সকলে একবাক্যে তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিলে তিনি বলেন,

তিনি তাদের মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। এই কথা শুনে জনতা হতভম্ব হয়ে যায় এবং আবু লাহাব প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুল (সা.)-কে অভিশাপ দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা সূরা লাহাব নাজিল করেন।³³

বিশ্লেষণ:

এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের ওপর তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। তিনি প্রথমে নিকটাত্মীয় ও পরে সাধারণ মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিয়ে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।

আবু লাহাবের তীব্র বিরোধিতা ছিল মূলত ক্ষমতা, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হারানোর ভয় থেকে উদ্ভূত, যা ছিল মক্কার অভিজাত শ্রেণির সামগ্রিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।

৪.৩ কুরাইশদের প্রতিরোধ ও নির্যাতন: এক অমানবিক অধ্যায়

প্রকাশ্যে দাওয়াতের পর কুরাইশদের বিরোধিতা ক্রমশ হিংস্র রূপ ধারণ করে। তারা ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করে।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও অপপ্রচার:

প্রথম দিকে তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উপহাস করত। তাঁকে ‘মাজনুন’ (পাগল), ‘সাহির’ (জাদুকর), ‘শায়ের’ (কবি) ইত্যাদি বলে অপপ্রচার চালাত। হজের সময় বহিরাগতদের কাছে তারা পরিকল্পিতভাবে রাসুল (সা.) সম্পর্কে মিথ্যাচার করত, যেন ইসলামের প্রভাব মক্কার বাইরে ছড়াতে না পারে।

তারা রাসুল (সা.)-কে থামাতে ব্যর্থ হয়ে আবু তালিবের কাছে বারবার প্রতিনিধি দল পাঠায়। একবার তারা আবু তালিবকে চরমপত্র দিলে, তিনি রাসুল (সা.)-কে বিষয়টি জানান। তখন রাসুল (সা.) তাঁর সেই ঐতিহাসিক উক্তি করেন:

এই অটল মনোভাব দেখে আবু তালিব তাঁকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।

শারীরিক নির্যাতন:

যখন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ব্যর্থ হলো, তখন তারা দুর্বল ও অসহায় মুসলিমদের ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করল।

  • হজরত বিলাল (রা.): তাঁর মনিব উমাইয়া বিন খালাফ তাঁকে দুপুরের তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রাখত, কিন্তু তাঁর মুখ থেকে শুধু “আহাদ, আহাদ” (আল্লাহ এক) ধ্বনিই বের হতো।³⁵
  • হজরত আম্মার (রা.) ও তাঁর পরিবার: তাঁর পিতা ইয়াসির ও মাতা সুমাইয়া (রা.)-কে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। আবু জাহেল হজরত সুমাইয়া (রা.)-কে বর্শার আঘাতে শহীদ করে, তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম নারী শহীদ।³⁶
  • হজরত খাব্বাব (রা.): তাঁকে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শোয়ানো হতো, তাঁর পিঠের চর্বি গলে আগুন নিভে যেত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নির্যাতন:

কাফিররা রাসুল (সা.)-এর ওপরও সরাসরি আক্রমণ করত। একদিন তিনি সিজদারত অবস্থায় থাকলে তাঁর পিঠে উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়।³⁷

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট:

ব্যক্তিগত নির্যাতন করেও যখন মুসলিমদের ঈমানকে টলানো গেল না, তখন কুরাইশরা সম্মিলিতভাবে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা কাবার দেয়ালে একটি চুক্তিপত্র ঝুলিয়ে দেয়, যেখানে শপথ করা হয় যে, এই দুই গোত্রের সাথে কোনো প্রকার বিয়ে-শাদী, ক্রয়-বিক্রয় এবং সামাজিক সম্পর্ক রাখা হবে না। এই বয়কট তিন বছর স্থায়ী হয়।

মুসলিমরা ‘শি’আবে আবি তালিব’ নামক এক উপত্যকায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁদের খাদ্যাভাব এতটাই তীব্র হয় যে, তাঁরা গাছের পাতা ও পশুর শুকনো চামড়া খেতে বাধ্য হন। শিশুদের ক্ষুধার্ত কান্না উপত্যকার বাইরে থেকেও শোনা যেত।

এই কঠিন সময়ে হজরত খাদিজা (রা.) তাঁর সমস্ত সম্পদ উম্মতের জন্য ব্যয় করেন। অবশেষে, আল্লাহর ইচ্ছায় চুক্তিপত্রটি উইপোকায় খেয়ে ফেলে (শুধুমাত্র ‘আল্লাহ’র নাম ছাড়া) এবং কিছু বিবেকবান কুরাইশ নেতার হস্তক্ষেপে এই অমানবিক বয়কট শেষ হয়।³⁸

৪.৪ ‘আমুল হুযন’ (দুঃখের বছর) ও তায়েফের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা

বয়কট শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় দুটি বিপর্যয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি তাঁর প্রধান আশ্রয়স্থল, চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী ও মানসিক শক্তির উৎস, হজরত খাদিজা (রা.)-কে হারান। এই বছরটি তাই ‘দুঃখের বছর’ নামে পরিচিত।³⁹

তায়েফে দাওয়াত:

মক্কায় সমর্থন হারানোর পর নতুন কোনো আশ্রয়ের আশায় তিনি জায়েদ বিন হারেসা (রা.)-কে সাথে নিয়ে প্রায় ষাট মাইল দূরে তায়েফে যান। কিন্তু তায়েফের বনু সাকিফ গোত্রের নেতারা তাঁর দাওয়াত গ্রহণ তো করলই না, বরং তাঁকে চরমভাবে অপমান করে এবং তাদের শহরের বখাটে ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়।

তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পাথর নিক্ষেপ করতে করতে শহর থেকে বের করে দেয়। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং তাঁর জুতো রক্তে ভরে যায়।

রাসুল (সা.)-এর দোয়া ও ক্ষমা:

শহরের বাইরে একটি আঙুরের বাগানে আশ্রয় নিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেন, তা ছিল তাঁর সবর ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক মর্মস্পর্শী দলিল। তিনি বলেন,

এমন সময় জিবরাইল (আ.) পাহাড়ের ফেরেশতাকে নিয়ে হাজির হন এবং বলেন, আল্লাহ তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন, তিনি চাইলে দুই পাহাড়কে একত্রিত করে তায়েফবাসীকে পিষে ফেলতে পারেন। কিন্তু ‘রহমাতুললিল আলামিন’ (বিশ্বজগতের জন্য রহমত) উত্তর দেন,

বিশ্লেষণ:

এই অধ্যায়টি মক্কী জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও কঠিন সময়ের প্রতিচ্ছবি। এটি একদিকে যেমন কাফিরদের নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ করে, তেমনি অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীদের ঈমান, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার সর্বোচ্চ শিখরকে উন্মোচন করে।

তায়েফের ঘটনা প্রমাণ করে, তাঁর মিশন ছিল শুধু বার্তা পৌঁছানোই নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ স্থাপন করা।

তথ্যসূত্র: চতুর্থ অধ্যায়

  • ²⁹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/২৭৪; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৮৮।
  • ³⁰ আল-কুরআন, সূরা আশ-শুআরা, ২৬:২১৪।
  • ³¹ আল-কুরআন, সূরা আল-হিজর, ১৫:৯৪।
  • ³² আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৮৩-৮৪; ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৪০-৪১।
  • ³³ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/২৮৩; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৮৪-৮৫।
  • ³⁴ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/২৮৯-২৯০; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৯৪।
  • ³⁵ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৩৩৯-৩৪০।
  • ³⁶ ইবনে সা’দ, কিতাবুত তাবাকাত আল-কবীর, ৮/২৪৮; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১০১।
  • ³⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৪০, ৩১৭৮।
  • ³⁸ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৩৫৪-৩৬৪; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১১০-১১৫।
  • ³⁹ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ১/৪১৬-৪১৭।
  • ⁴⁰ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩২৩১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৯৫; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ১২১-১২৩।

Ha-mim Zubaer