খায়বার বিজয়

দ্বাদশ অধ্যায়: খায়বার বিজয় ও মুতার অভিযান (ষড়যন্ত্রের অবসান ও পরাশক্তির মুখোমুখি)

দ্বাদশ অধ্যায়: খায়বার বিজয় ও মুতার অভিযান (ষড়যন্ত্রের অবসান ও পরাশক্তির মুখোমুখি)

হুদায়বিয়ার সন্ধি মদিনার দক্ষিণ ফ্রন্টকে সুরক্ষিত করার পর, রাসুলুল্লাহ (সা.) এবার উত্তর দিকে ইসলামের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ও ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু—খায়বারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। হুদায়বিয়ার শান্তি চুক্তি ছিল এক মাস্টারস্ট্রোক, যা মুসলিমদের মক্কার আক্রমণ থেকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মদিনা রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে সচেষ্ট হয়।

এই অধ্যায়টি মুসলিমদের কৌশলগত পরিপক্কতা, সামরিক প্রজ্ঞা এবং বিশ্বমঞ্চে এক নতুন অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে তাদের আত্মপ্রকাশের বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরে।

১২.১ খায়বার অভিযান: ষড়যন্ত্রের মূল উৎপাটন (সপ্তম হিজরি)

গভীর প্রেক্ষাপট ও অনিবার্য সংঘাত:

খায়বার শুধু একটি সাধারণ ইহুদি জনপদ ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন আরবের অন্যতম সুরক্ষিত, সম্পদশালী এবং সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী এক কৃষি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এটি মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রের প্রধান ও সক্রিয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। মদিনা থেকে বিতাড়িত বনু নাজির গোত্রের নেতারা খায়বারে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে এক পরিকল্পিত ইসলামবিরোধী জোট গঠন করে।

তারাই আরবের বিভিন্ন বেদুইন গোত্র, বিশেষ করে গাতফানকে, অর্থ ও সম্পদের লোভ দেখিয়ে খন্দকের যুদ্ধে মদিনা আক্রমণের জন্য একত্রিত করেছিল। খায়বার ছিল মদিনার জন্য এক বিষফোঁড়ার মতো, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারত। এখানকার ইহুদি নেতারা প্রতিনিয়ত আরবের বিভিন্ন প্রান্তের গোত্রগুলোকে মদিনার বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছিল।

তাই মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নবগঠিত ইসলামি সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই ষড়যন্ত্রের মূল উৎপাটন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। খায়বার টিকে থাকা মানেই মদিনার ওপর সার্বক্ষণিক যুদ্ধের শঙ্কা ঝুলে থাকা।⁹⁵

ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি ও অভিযান:

হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকে ফিরে আসার পথে যখন অনেক সাহাবীর মন আপাত দৃষ্টিতে একপেশে চুক্তির কারণে কিছুটা ভারাক্রান্ত ছিল, ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফাতহে মুসলিমদের এই আসন্ন বিজয়ের সুসংবাদ দেন, যা তাদের অন্তরে এক নতুন আশার সঞ্চার করে:

এই ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধুমাত্র হুদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রায় ১৬০০ সাহাবীর এক বিশেষ ও পরীক্ষিত বাহিনী নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে খায়বারের দিকে যাত্রা করেন। এই গোপনীয়তার মূল কৌশল ছিল যেন তাদের মিত্র গাতফান গোত্র দূর থেকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে না পারে। যখন খায়বারবাসীরা সকালে তাদের কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে বাইরে বের হলো, তখন তারা আকস্মিকভাবে মুসলিম বাহিনীকে দেখে হতবাক হয়ে যায় এবং দুর্গের ভেতর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।⁹⁶

দুর্গ বিজয় ও হজরত আলি (রা.)-এর কিংবদন্তিতুল্য বীরত্ব:

খায়বার ছিল মূলত আটটি প্রধান দুর্গের এক জটিল সমষ্টি, যা প্রাকৃতিকভাবেই উঁচু পাহাড় এবং পাথুরে অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দুর্ভেদ্য ছিল। মুসলিমরা অভাবনীয় সাহসিকতার সাথে একের পর এক ছোট দুর্গগুলো জয় করতে শুরু করলেও, খায়বারের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত দুর্গ ‘আল-কামুস’-এর পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

কয়েকদিন ব্যাপী দীর্ঘ অবরোধ এবং তীব্র লড়াইয়ের পরও দুর্গটির পতন ঘটছিল না। এই দুর্গের দায়িত্বে ছিল মারহাব নামক এক কিংবদন্তিতুল্য আরব-ইহুদি বীর, যার বিশাল দেহ ও যুদ্ধবিদ্যা সমগ্র আরবে বিখ্যাত ছিল। কয়েকদিন ব্যর্থ চেষ্টার পর এক সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন:

এই ঘোষণা সাহাবীদের মধ্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক শিহরণ তৈরি করে। প্রত্যেকেই আশা করছিলেন যে এই পরম সৌভাগ্য যেন তাঁরই হয়। পরদিন সকালে রাসুল (সা.) হজরত আলি (রা.)-কে ডাকলেন, যিনি তখন চোখের তীব্র সংক্রমণে ভুগছিলেন এবং প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। রাসুল (সা.) তাঁর পবিত্র মুখের লালা আলির চোখে লাগিয়ে দিলে তা এক অলৌকিক মুজিজার মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।

হজরত আলি (রা.) অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। মারহাব দম্ভভরে এগিয়ে এলে হজরত আলি (রা.) দ্বৈত লড়াইয়ে তীব্র পরাক্রমের সাথে তাকে মাত্র কয়েক আঘাতেই হত্যা করেন। তাঁর এই অভাবনীয় বীরত্ব ইহুদি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত কামুস দুর্গের পতন ঘটে।⁹⁷

চুক্তি, ফলাফল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

আল-কামুস দুর্গের পতনের পর খায়বারের অন্যান্য ইহুদিরা মনোবল হারিয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়। চরম শত্রুতা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রতি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উদারতা প্রদর্শন করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখা হয় এবং উৎপাদিত ফসলের অর্ধেকের বিনিময়ে তাদের নিজেদের ভূমিতেই বসবাস ও চাষাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এটি ছিল এক অভাবনীয় মানবিক চুক্তি, কারণ তৎকালীন যুদ্ধরীতি অনুযায়ী বিজিতদের সাধারণত দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হতো।⁹⁸

বিশ্লেষণ:

খায়বার বিজয় ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক বিরাট মাইলফলক। সামরিকভাবে, এটি মদিনার উত্তর দিকের সবচেয়ে বড় ও সুসংগঠিত হুমকিকে চিরতরে নির্মূল করে। অর্থনৈতিকভাবে, খায়বারের বিশাল কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের বিজয় প্রথমবারের মতো মুসলিমদের আর্থিক অবস্থাকে সচ্ছল করে তোলে, যার ফলে মুহাজির সাহাবীরা আনসারদের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হন।

রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে, এই চুক্তি একটি ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্তব্য নির্ধারণের প্রথম ব্যবহারিক উদাহরণ স্থাপন করে। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্র তার অমুসলিম নাগরিকদের জান ও মালের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বিষ প্রয়োগের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র:

খায়বার বিজয়ের পর, যখন শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছিল, তখন যায়নাব বিনতে হারিস নামক এক ইহুদি নারী রাসুল (সা.)-কে ভেড়ার রানের মাংসে তীব্র বিষ মিশিয়ে উপহার হিসেবে পাঠায়। সে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল যে নবীজি (সা.) ভেড়ার সামনের পায়ের মাংস (রান) বেশি পছন্দ করেন।

রাসুল (সা.) মাংসের এক লোকমা মুখে দিয়েই আল্লাহর হুকুমে ষড়যন্ত্রটি বুঝতে পারেন। মাংসের হাড় অলৌকিকভাবে তাঁকে বিষের উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। কিন্তু তাঁর সাথে খেতে বসা সাহাবী বিশর ইবনে বারা (রা.) ততক্ষণে তা গিলে ফেলেন এবং তীব্র বিষাক্রান্ত হয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

রাসুল (সা.) ব্যক্তিগতভাবে যায়নাবকে তার এই জঘন্য অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিলেও, বিশর (রা.)-এর মৃত্যুর কারণে রাষ্ট্রীয় সুবিচার ও ইসলামি আইন ‘কিসাস’ (হত্যার বদলে হত্যা) অনুযায়ী পরবর্তীতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে ব্যক্তিগত ক্ষমার চেয়ে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ঊর্ধ্বতন।⁹⁹

১২.২ মুতার যুদ্ধ: পরাশক্তির সাথে প্রথম অসম লড়াই (অষ্টম হিজরি)

খায়বার বিজয়ের পর ইসলামের প্রভাব যখন আরবের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বলয়ে প্রবেশ করছিল, তখন তৎকালীন সুপারপাওয়ার বাইজান্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিমদের প্রথম সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটি ছিল আঞ্চলিক শক্তি থেকে বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রথম পরীক্ষা।

প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধের কারণ:

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বজনীন দাওয়াতের অংশ হিসেবে বুসরার (সিরিয়া) শাসকের কাছে হজরত হারিস ইবনে উমাইর (রা.)-কে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। কিন্তু বাইজান্টাইনদের অধীনস্থ গাসসানি গোত্রের অহংকারী শাসক শুরাহবিল ইবনে আমর আন্তর্জাতিক সকল রীতিনীতি ও প্রটোকল লঙ্ঘন করে সেই দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

তৎকালীন এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনেও দূত হত্যা ছিল সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল, যা মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক চরম অবমাননা। একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র যদি এই অপমানের জবাব না দেয়, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার কোনো সম্মান ও নিরাপত্তা অবশিষ্ট থাকবে না।¹⁰⁰

রাসুল (সা.)-এর নৈতিক নির্দেশনা ও সেনাপতি নির্বাচন:

এই ঔদ্ধত্যের জবাব দেওয়ার জন্য এবং মদিনা রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার তাগিদে রাসুল (সা.) ৩,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। তিনি জানতেন রোমান বাহিনীর বিশালত্ব সম্পর্কে, তাই তিনি তিনজন সেনাপতিকে পর্যায়ক্রমে নেতৃত্বের জন্য নির্বাচন করেন—জায়েদ ইবনে হারেসা, জাফর ইবনে আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)।

যাত্রার পূর্বে তিনি সেনাবাহিনীকে যে নির্দেশনা দেন, তা ছিল ইসলামের যুদ্ধনীতির এক উজ্জ্বল দলিল। যেখানে রোমান বা পারস্য বাহিনী বিজিত অঞ্চলে ধ্বংসলীলা চালাত, সেখানে নবীজি (সা.) নির্দেশ দেন:

এই নির্দেশনা আধুনিক জেনেভা কনভেনশনের শত শত বছর আগেই মানবাধিকার ও যুদ্ধকালীন নৈতিকতার এক অভাবনীয় মানদণ্ড স্থাপন করেছিল।

শাহাদাতের অমর দৃষ্টান্ত:

সিরিয়ার ‘মুতা’ নামক স্থানে ৩,০০০ মুসলিম সৈন্য যখন পৌঁছায়, তখন তারা প্রায় দুই লক্ষাধিক সুসজ্জিত বাইজান্টাইন ও তাদের মিত্র আরব বাহিনীর এক বিশাল সমুদ্রের মুখোমুখি হয়। সৈন্যসংখ্যার এই বিশাল ব্যবধান (প্রায় ১:৬৬) সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী পিছপা হয়নি।

এই অসম যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতিরা শাহাদাতের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। প্রথমে জায়েদ (রা.) অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। এরপর রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই জাফর (রা.) পতাকা হাতে নেন। তাঁর ডান হাত কাটা গেলে তিনি বাম হাতে পতাকা ধরেন, বাম হাত কাটা গেলে তিনি তাঁর কর্তিত বাহু দিয়ে বুকের সাথে পতাকা আঁকড়ে ধরে রাখেন, শেষ পর্যন্ত তিনিও শহীদ হন। তাঁর শরীরে ৯০টিরও বেশি বর্শা ও তলোয়ারের আঘাত ছিল।

জাফর (রা.)-এর শাহাদাতের পর রাসুল (সা.) তাঁকে জান্নাতে দুটি ডানা দিয়ে উড়তে দেখেছেন বলে তাঁকে ‘জাফর আত-তাইয়ার’ (উড়ন্ত জাফর) উপাধি দেওয়া হয়। এরপর কবি সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন।¹⁰²

খালিদ বিন ওয়ালিদের রণকৌশল ও ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি:

তিনজন সেনাপতি শহীদ হওয়ার পর, মুসলিম বাহিনী যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে, তখন সাহাবীরা সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী কুরাইশ বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে সর্বসম্মতভাবে সেনাপতি নির্বাচন করেন।

খালিদ (রা.) রাতের অন্ধকারে তাঁর অতুলনীয় সামরিক প্রজ্ঞা ও রণকৌশল প্রয়োগ করেন। তিনি বাহিনীর বিন্যাস পরিবর্তন করেন—পেছনের সারিকে সামনে, সামনের সারিকে পেছনে এবং ডান ও বাম পাশকে অদলবদল করে দেন। পরদিন রোমানরা নতুন মুখ ও নতুন পতাকা দেখে ভীত হয়ে পড়ে, তারা ভাবে মদিনা থেকে হয়তো বিশাল সাহায্যকারী বাহিনী এসে পৌঁছেছে।

এই মনস্তাত্ত্বিক ভীতিকে কাজে লাগিয়ে খালিদ (রা.) সুশৃঙ্খলভাবে মুসলিম বাহিনীকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিরাপদে মদিনায় ফিরিয়ে আনেন। তাঁর এই বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ‘সাইফুল্লাহ’ (আল্লাহর তলোয়ার) উপাধিতে ভূষিত করেন।

মদিনায় বসে রাসুল (সা.) ওহীর মাধ্যমে শত মাইল দূরের যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত সরাসরি দেখছিলেন এবং সাহাবীদের কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করছিলেন, যা ছিল তাঁর একটি জীবন্ত মুজিজা।¹⁰³

বিশ্লেষণ:

মুতার যুদ্ধ বাহ্যিকভাবে কোনো চূড়ান্ত ভূখণ্ডগত বিজয় ছিল না, কিন্তু কৌশলগত, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি ছিল মুসলিমদের জন্য এক বিরাট সাফল্য।

তৎকালীন বিশ্বের সুপারপাওয়ার রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি ছোট বাহিনী নিয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, যা সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোর চোখে মুসলিমদের সামরিক শক্তি ও ঈমানী দৃঢ়তার এক অকাট্য প্রমাণ স্থাপন করে। এটি তাদের বুঝিয়ে দেয় যে, মুসলিমরা এখন আর কোনো ছোট গোত্র নয়, বরং তারা রোমান সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো এক উদীয়মান আন্তর্জাতিক শক্তি, যা ভবিষ্যতে রোমান সাম্রাজ্য জয়ের প্রথম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তথ্যসূত্র: দ্বাদশ অধ্যায়

  • ⁹⁵ আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪৪-৩৪৫; ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩২৯।
  • ⁹⁶ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৩৪; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৪৬-৩৪৭।
  • ⁹⁷ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৭৬৯, ৪২১০; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪০৬; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৫০-৩৫২।
  • ⁹⁸ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৩৩৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৫৪।
  • ⁹⁹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৬১৭; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৫৫-৩৫৬।
  • ¹⁰⁰ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৩৭৩; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৬১।
  • ¹⁰¹ মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ; ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা’আদ, ৩/৩৩৮।
  • ¹⁰² সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪২৬২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৬৩-৩৬৪।
  • ¹⁰³ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪২৬২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৩৬৫।

Ha-mim Zubaer