চতুর্দশ অধ্যায়: তাবুক অভিযান ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি
মক্কা বিজয় এবং হুনাইনের যুদ্ধের পর ইসলাম আরব উপদ্বীপের প্রধান ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। আরবের পৌত্তলিকতাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে এবং বিভিন্ন গোত্র দলে দলে মদিনার আনুগত্য স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।
এমতাবস্থায়, ইসলামের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব তৎকালীন বিশ্বের সুপারপাওয়ার বাইজান্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের জন্য এক বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুতার যুদ্ধ তাদের দেখিয়েছিল যে, এই নতুন শক্তিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। মদিনা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন নগর-রাষ্ট্র নয়, বরং এটি একটি উদীয়মান আন্তর্জাতিক পরাশক্তি।
১৪.১ প্রেক্ষাপট: নতুন হুমকি ও যুদ্ধের আহ্বান
নবম হিজরির রজব মাসে মদিনায় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, বাইজান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর অধীনস্থ গাসসানি আরব খ্রিস্টান গোত্রগুলোকে সাথে নিয়ে মুসলিমদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য সিরিয়ায় এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করছেন। রোমানরা চেয়েছিল মুসলিমরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও শক্তিশালী হওয়ার আগেই তাদের মদিনার সীমানার ভেতরেই ধ্বংস করে দিতে।
এই খবরটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম হুমকি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন এবং সরাসরি রোমানদের মোকাবেলা করার জন্য এক সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেন।
অন্যান্য যুদ্ধের সময় রাসুল (সা.) সাধারণত গন্তব্য গোপন রাখতেন, কিন্তু এবার তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে গন্তব্য হলো রোমান সীমান্ত। এটিই ছিল ঐতিহাসিক তাবুক অভিযান।¹¹²
‘জাইশুল উসরা’ বা কষ্টের সেনাবাহিনী:
এই অভিযানের আহ্বানটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক কঠিনতম পরীক্ষা। এর কারণগুলো ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল:
- চরম গ্রীষ্ম: সময়টি ছিল আরবের প্রচণ্ড গরমের মৌসুম। মরুভূমির তপ্ত বালু এবং জ্বলন্ত রোদ দীর্ঘ সফরের জন্য ছিল এক মৃত্যুফাঁদ।
- অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ: মদিনায় তখন খরা চলছিল এবং খাদ্যের অভাব ছিল তীব্র। মানুষের কাছে সফরের রসদ জোগাড় করার মতো ন্যূনতম অর্থও ছিল পরিচয় না।
- ফসল পাকার মৌসুম: এটি ছিল খেজুর পাকার সময়, যা ছিল মদিনার আনসারদের সারা বছরের প্রধান আয় ও খাদ্যের উৎস। এই সময়ে বাগান ছেড়ে যাওয়া মানে সারা বছরের উপার্জনকে বিসর্জন দেওয়া।
- শক্তিশালী প্রতিপক্ষ: প্রতিপক্ষ কোনো আরব গোত্র ছিল না, বরং তারা ছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি রোমান সাম্রাজ্য, যাদের বিশাল বাহিনী ও উন্নত যুদ্ধাস্ত্রের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ছিল।
বিশ্লেষণ:
এই কঠিন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের আহ্বানটি ছিল ঈমানের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। কারা প্রকৃত মুমিন, এবং কারা মুনাফিক, তা উন্মোচিত করার জন্যই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এই বিশেষ আয়োজন। আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময় অনেকেই ঈমানের দাবি করে, কিন্তু চরম সংকটময় মুহূর্তে কেবল খাঁটি মুমিনরাই নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারে।
একারণে পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবাহ, যা এই অভিযানের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়, তাকে ‘সূরা আল-ফাদিহা’ (উন্মোচনকারী সূরা)-ও বলা হয়, কারণ এটি মুনাফিকদের মুখোশ চিরতরে উন্মোচন করে দিয়েছিল।
১৪.২ সাহাবীদের প্রতিক্রিয়া: ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় প্রতিযোগিতা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আহ্বানে সাহাবীরা ত্যাগের এমন এক প্রতিযোগিতা শুরু করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের মাঝেও ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তাঁরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা মানব ইতিহাসে বিরল।
ধনী সাহাবীদের অবদান
হজরত উসমান বিন আফফান (রা.): তিনি এই যুদ্ধে দানের এক কিংবদন্তিতুল্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি একাই সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশের খরচ বহন করেন।
তিনি প্রায় ৯০০ উট, ১০০ ঘোড়া এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রাসুল (সা.)-এর কোলে ঢেলে দেন। তাঁর এই দানে রাসুল (সা.) এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে তিনি আনন্দচিত্তে বলেন,
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.): তিনি তাঁর ঘরের সমস্ত সম্পদ নিয়ে রাসুল (সা.)-এর সামনে হাজির হন। তাঁর দানের পরিমাণ হয়তো উসমানের (রা.) মতো বিশাল ছিল না, কিন্তু আনুপাতিক হারে তা ছিল ১০০%। রাসুল (সা.) যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন,
তিনি সেই ঐতিহাসিক ও ঈমানদীপ্ত উত্তর দেন,
হজরত ওমর ফারুক (রা.): তিনি তাঁর মোট সম্পদের অর্ধেক নিয়ে আসেন, এই ভেবে যে আজ তিনি হয়তো দানে আবু বকর (রা.)-কে ছাড়িয়ে যাবেন। কিন্তু আবু বকর (রা.)-এর সর্বস্ব ত্যাগের কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন ঈমানের এই প্রতিযোগিতায় আবু বকর চিরকাল অজেয়। তিনি বলেন,
গরিব সাহাবীদের আকুতি (‘আল-বাক্কা’উন’):
একদল গরিব সাহাবী, যাঁদের বাহন বা যুদ্ধের সরঞ্জাম কেনার মতো কোনো সামর্থ্য ছিল না, রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন।
রাসুল (সা.) যখন তাঁদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করতে না পেরে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন তাঁরা এই অভিযানে অংশ নিতে না পারার দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান। তাঁদের এই আন্তরিক অশ্রুর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা কুরআনে আয়াত নাজিল করেন। ইতিহাসে তাঁরা ‘আল-বাক্কা’উন’ (অধিক ক্রন্দনকারী) নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।¹¹⁵
১৪.৩ তাবুকের পথে: এক কষ্টকর যাত্রা
প্রায় ৩০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবুকের দিকে যাত্রা করেন। এটিই ছিল তাঁর জীবদ্দশায় পরিচালিত সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনী। কিন্তু এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও ভয়াবহ।
তীব্র গরম, পানির চরম সংকট এবং খাদ্যের অভাবে সাহাবীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, তাঁরা উট জবাই করে তার পেটে সঞ্চিত পানি পান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গাছের শুকনো পাতা খেয়ে তাঁরা জীবন ধারণ করেছিলেন।
কিন্তু ঈমানের বলে তাঁরা সকল কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে যান। কোনো অভিযোগ বা হতাশা তাঁদের এই মহাজাগতিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। এটি ছিল নিছক কোনো সামরিক যাত্রা নয়, বরং এটি ছিল জাগতিক সীমানা পেরিয়ে আত্মিক উন্নতির এক চরম পরীক্ষা।¹¹⁶
১৪.৪ তাবুকের ময়দানে: যুদ্ধ ছাড়াই বিজয়
মুসলিমদের এই বিশাল ও ঈমানদীপ্ত বাহিনীর আগমনের খবর শুনে রোমান ও তাদের মিত্র বাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ধারণা করতে পারেনি যে, এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মুসলমানরা এত বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাহস দেখাবে।
ফলে, তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটে এবং কোনো ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই মুসলমানরা এক বিশাল কৌশলগত বিজয় লাভ করে।
কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিজয়:
যুদ্ধ না হলেও তাবুক অভিযান ছিল এক সুস্পষ্ট বিজয়।
- শক্তির প্রদর্শন: এই অভিযান বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দোরগোড়ায় ইসলামের সামরিক শক্তিকে এমনভাবে প্রদর্শন করে যে, তারা পরবর্তীতে বহু বছর আরব উপদ্বীপের দিকে তাকানোর সাহস পায়নি। এটি রোমানদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করে।
- সীমান্ত সুরক্ষিত করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবুকে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন খ্রিস্টান ও ইহুদি গোত্রের শাসকদের (যেমন আইলার শাসক ইউহান্না বিন রুবাহ) সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তারা মদিনা রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে ‘জিজিয়া’ (নিরাপত্তা কর) প্রদানের বিনিময়ে নিজেদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা লাভ করে। এর মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের উত্তর সীমান্ত সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত হয়।¹¹⁷
‘মসজিদে দিরার’ ধ্বংস:
এই সফরের সময়েই আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের নির্মিত ‘মসজিদে দিরার’ (ক্ষতিকর মসজিদ)-এর ষড়যন্ত্র উন্মোচন করে দেন। আবু আমির নামক এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর প্ররোচনায় মদিনার মুনাফিকরা এটি নির্মাণ করেছিল।
এটি ইবাদতের জন্য নয়, বরং মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। রাসুল (সা.) মদিনায় ফিরে এসে সেই মসজিদটি পুড়িয়ে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন, যা মুসলিম সমাজকে ভবিষ্যৎ গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে।¹¹⁸
১৪.৫ প্রত্যাবর্তন ও চূড়ান্ত শিক্ষা
তাবুক থেকে ফিরে আসার পর রাসুল (সা.) যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা ব্যক্তিদের কৈফিয়ত তলব করেন। মুনাফিকরা এসে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে ক্ষমা লাভ করে, কিন্তু তিনজন প্রকৃত মুমিন— কা’ব ইবনে মালিক, মুরারা ইবনুর রাবি এবং হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) —কোনো মিথ্যা না বলে নিজেদের ভুল স্বীকার করেন।
রাসুল (সা.) তাঁদেরকে শাস্তি হিসেবে পঞ্চাশ দিনের জন্য কঠোর সামাজিক বয়কটের নির্দেশ দেন। এই পঞ্চাশ দিন তাঁদের জন্য ছিল মৃত্যুসম যন্ত্রণার। এমনকি তাঁদের স্ত্রীরাও তাঁদের থেকে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু তাঁরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি এবং ঈমানের ওপর অবিচল ছিলেন।
অবশেষে, আল্লাহ তাআলা তাঁদের আন্তরিক অনুশোচনা কবুল করে সূরা আত-তাওবাহ-এ তাঁদের ক্ষমার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নাজিল করেন, যা মদিনায় আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়।¹¹⁹
বিশ্লেষণ:
এই ঘটনাটি ইসলামি সমাজে শৃঙ্খলা, নেতার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং আন্তরিক তাওবার গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কাছে চাতুর্যপূর্ণ মিথ্যা অজুহাতের চেয়ে ভুল স্বীকার ও আন্তরিক অনুশোচনা অনেক বেশি প্রিয়।
তাবুক অভিযান ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে শেষ সামরিক অভিযান। এটি মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করে মুসলিম সমাজকে অভ্যন্তরীণভাবে পরিশুদ্ধ করে এবং ইসলামকে একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
তথ্যসূত্র: চতুর্দশ অধ্যায়
- ¹¹² ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৫১৬-৫১৭; আর-রাহিকুল মাখতুম,পৃ. ৪১৩-৪১৪।
- ¹¹³ জামে তিরমিযী, হাদিস নং ৩৬৮৫; আর-রাহিকুল মাখতুম,পৃ. ৪১৬।
- ¹¹⁴ জামে তিরমিযী; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৬।
- ¹¹⁵ আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৯২; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৭।
- ¹¹⁶ ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ, ২/৫২২; আর-রাহিকুল মাখতুম,পৃ. ৪১৮-৪১৯।
- ¹¹⁷ আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪২১-৪২২।
- ¹¹⁸ আল-কুরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১০৭-১১০; আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৬-৪২৭।
- ¹¹⁹ সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪৪১৮; আর-রাহিকুল মাখতুম,পৃ. ৪২৪-৪২৬।