আবরাহার হস্তীবাহিনী ও আমুল ফিল: কাবার সুরক্ষায় ঐশী হস্তক্ষেপ এবং অহংকারের পতন

আবরাহার হস্তীবাহিনী ও পবিত্র কাবার সুরক্ষায় আবাবিল পাখির আক্রমণের ঐতিহাসিক দৃশ্যপট।

প্রারম্ভিকা: আবরাহার হস্তীবাহিনী

৫৭০ খ্রিস্টাব্দের কথা। আরবের রুক্ষ মরুভূমির বুকে হঠাৎ করেই এক অভূতপূর্ব আতঙ্কের সৃষ্টি হলো। ইয়েমেন থেকে মক্কার দিকে ধেয়ে আসছে এক বিশাল এবং সুসজ্জিত সেনাবাহিনী।

এই বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি ছিল তাদের সামনের সারিতে থাকা বিশাল আকৃতির যুদ্ধ-হাতিগুলো, যা মক্কার আরবরা এর আগে কখনো দেখেনি। তাদের লক্ষ্য কোনো ধনসম্পদ লুণ্ঠন নয়, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল কালো পাথরের তৈরি একটি পবিত্র চারকোনা ঘর—কাবাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়া।

কিন্তু বিশ্বের তৎকালীন অন্যতম পরাক্রমশালী এই বাহিনী কি সফল হয়েছিল? নাকি এক ঐশী জাদুকরী হস্তক্ষেপে তাদের অহংকার মিশে গিয়েছিল মরুভূমির বালুতে?

আজকের এই প্রবন্ধে আমরা নিছক একটি অলৌকিক ঘটনার বাইরে গিয়ে, ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির আলোকে ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীবর্ষের সেই রোমাঞ্চকর ঘটনাটি বিশ্লেষণ করব।

সংঘাতের পটভূমি: ধর্মীয় আড়ালে অর্থনৈতিক আধিপত্যের লোভ

আবরাহা আল-আশরাম ছিল ইয়েমেনের নিযুক্ত আবিসিনীয় (ইথিওপিয়ান) শাসক। সে অত্যন্ত চতুর এবং উচ্চাভিলাষী একজন নেতা ছিল।

আবরাহা লক্ষ করল, প্রতি বছর হজ্বের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মক্কায় যায়। এই তীর্থযাত্রার কারণে মক্কার কুরাইশরা বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা ভোগ করছে।

আবরাহা চাইল মক্কার এই অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় মনোপলি ভেঙে দিতে। সে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ‘আল-কুল্লাইস’ নামে সোনা-রুপা এবং দামি পাথর দিয়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ একটি ক্যাথেড্রাল বা উপাসনালয় নির্মাণ করল। তার উদ্দেশ্য ছিল আরবদের তীর্থযাত্রাকে মক্কা থেকে ইয়েমেনের দিকে ঘুরিয়ে আনা, যাতে ইয়েমেন আরবের প্রধান বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

ক্ষোভের বিস্ফোরণ: এক বেদুইনের দুঃসাহসিক কাণ্ড

আবরাহার এই আধিপত্য বিস্তারের কৌশল মক্কার আরবদের চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। পবিত্র কাবার প্রতি আরবদের ভালোবাসা ছিল নিঃশর্ত এবং তাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক।

ইতিহাসে বর্ণিত আছে, ‘কিনানা’ গোত্রের এক সাধারণ বেদুইন রাতের অন্ধকারে আবরাহার সেই জাঁকজমকপূর্ণ গির্জায় ঢুকে মলমূত্র ত্যাগ করে আসে। কেউ কেউ বলেন, সে সেখানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।

এই খবর শুনে আবরাহা চরম অপমানিত বোধ করে। সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে শপথ করে যে, সে মক্কায় গিয়ে কাবাঘর ইট ইট করে ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। গির্জার অবমাননা তার জন্য ছিল কেবল একটি অজুহাত (Casus Belli); তার মূল লক্ষ্য ছিল কাবার পতন ঘটিয়ে মক্কার অর্থনীতি দখল করা।

হাতির পিঠে অহংকার: মক্কার পথে আবরাহার বাহিনী

আবরাহা প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য এবং ১৩টি (মতান্তরে ৯টি বা ১টি বিশাল) হাতির এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হলো। বাহিনীর সবচেয়ে বড় এবং প্রধান হাতিটির নাম ছিল ‘মাহমুদ’।

পথিমধ্যে আরবের কয়েকটি ছোট গোত্র আবরাহাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। জু-নাফর এবং নুফাইল ইবনে হাবিবের মতো সাহসী আরবরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেও আবরাহার বিশাল বাহিনীর কাছে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বন্দি হয়। পরাজিত ও বন্দি হওয়ার পর এই নুফাইলকেই আবরাহার বাহিনীর পথপ্রদর্শক (Guide) হিসেবে মক্কার পথ চেনানোর জন্য বাধ্য করা হয়েছিল।

আবরাহার বাহিনী তায়েফ অতিক্রম করে মক্কার অদূরে ‘মুগাম্মাস’ নামক স্থানে এসে তাঁবু গাড়ে। সেখান থেকে আবরাহার সৈন্যরা মক্কাবাসীদের অনেক উট ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যায়, যার মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের (রাসূল সা.-এর দাদা) ২০০টি উটও ছিল।

আবদুল মুত্তালিবের প্রজ্ঞা: “আমি উটের মালিক, কাবার মালিক আল্লাহ”

আবরাহা তার একজন দূতকে মক্কায় পাঠাল এই বার্তা দিয়ে যে, তারা মানুষ হত্যা করতে আসেনি, শুধু কাবা ভাঙতে এসেছে। কুরাইশরা যদি বাধা না দেয়, তবে কারো রক্ত ঝরবে না।

মক্কার তৎকালীন প্রধান নেতা আবদুল মুত্তালিব পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন। ৬০ হাজার সৈন্যের এই সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো জনবল বা অস্ত্র কুরাইশদের ছিল না। তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে তার তাঁবুতে গেলেন।

আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন, গম্ভীর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আবরাহা তাকে দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে, সে নিজে সিংহাসন থেকে নেমে তার পাশে কার্পেটে বসেছিল।

আবরাহা ভাবল, এই মহান নেতা নিশ্চয়ই এখন কাবার সুরক্ষার জন্য অনুনয়-বিনয় করবে। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আপনার সৈন্যরা আমার যে ২০০টি উট নিয়ে এসেছে, তা আমাকে ফেরত দিন।”

আবরাহা অবাক এবং কিছুটা হতাশ হয়ে বলল, “আপনাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু এখন আপনার কথা শুনে আমি হতাশ। আপনি আপনার উট নিয়ে চিন্তিত, অথচ আমি এসেছি আপনার এবং আপনার পূর্বপুরুষদের পবিত্র ঘর ভাঙতে, সে ব্যাপারে আপনি কিছুই বলছেন না!”

তখন আবদুল মুত্তালিব সেই ঐতিহাসিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তরটি দিয়েছিলেন:

“আমি হলাম উটগুলোর মালিক (তাই আমি উটগুলো রক্ষা করতে এসেছি)। আর ওই ঘরের (কাবার) একজন মালিক আছেন, তিনি নিজেই তাঁর ঘরকে রক্ষা করবেন।”

আবাবিল পাখির হামলা: সূরা ফিলের বাস্তব রূপ

উটগুলো নিয়ে মক্কায় ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদের নির্দেশ দিলেন শহর খালি করে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিতে। এরপর তিনি কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে পাহাড়ে চলে গেলেন।

পরদিন সকালে আবরাহা তার বাহিনী এবং বিশাল হাতি ‘মাহমুদ’-কে কাবার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। কিন্তু এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল!

হাতিটিকে যখন ইয়েমেনের দিকে ঘোরানো হয়, সে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। কিন্তু মক্কার দিকে ঘোরালেই সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। শত আঘাত করেও তাকে কাবার দিকে এক কদমও অগ্রসর করানো গেল না।

ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, কাবা শরীফের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর এই বন্দি নুফাইল ইবনে হাবিবই সুযোগ বুঝে প্রধান হাতি মাহমুদের কানে কানে বলেছিলেন, “হে মাহমুদ! তুই হাঁটু গেড়ে বসে পড় এবং যেখান থেকে এসেছিস সেখানে নিরাপদে ফিরে যা, কারণ তুই আল্লাহর পবিত্র শহরে আছিস।” এরপরই হাতিটি বসে পড়ে।

এমন সময় সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট পাখি উড়ে আসতে শুরু করল। ইসলামি ইতিহাসে এদের ‘আবাবিল’ পাখি বলা হয়। প্রতিটি পাখির ঠোঁটে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে মোট তিনটি ছোট কঙ্কর (পোড়ামাটির পাথর) ছিল।

পাখিগুলো আবরাহার বাহিনীর ওপর সেই পাথরগুলো বৃষ্টির মতো নিক্ষেপ করতে লাগল। এই পাথর যার গায়েই পড়ত, তার শরীর গলে গিয়ে মাংস খসে পড়তে শুরু করত। কুরআনের ভাষায়, তাদের অবস্থা চিবানো ঘাসের মতো হয়ে গিয়েছিল।

“আপনি কি দেখেননি আপনার রব হস্তীবাহিনীর সাথে কীরূপ আচরণ করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের ওপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। যারা তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করছিল। অতঃপর তিনি তাদেরকে চিবানো ঘাসের মতো করে দিলেন।” — (সূরা আল-ফিল: ১-৫)

আবরাহা নিজেও এই পাথরের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়। পালিয়ে যাওয়ার পথে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খসে পড়তে থাকে এবং সানায় পৌঁছানোর পর অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কভাবে তার মৃত্যু হয়।

এই বছরটিকে আরবরা ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীবর্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর ঠিক এই ঘটনার মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ দিন পরই মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন মানবতার মুক্তির দূত, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

আমাদের জন্য শিক্ষা (Takeaways)

আবরাহার হস্তীবাহিনীর পতন নিছক একটি ঐতিহাসিক গল্প নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক বিশাল শিক্ষণীয় অধ্যায়:

  • অহংকারের অনিবার্য পতন: ক্ষমতা, সম্পদ বা সামরিক শক্তির অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। আবরাহা তার বিশাল বাহিনীর অহংকারে মত্ত ছিল, কিন্তু আল্লাহর কাছে জাগতিক ক্ষমতার কোনো মূল্য নেই। অহংকারের পতন সব যুগেই অনিবার্য।
  • ধর্মের মোড়কে অর্থনৈতিক লালসা: আবরাহা গির্জা বানিয়েছিল ধর্মীয় আবেগে নয়, বরং মক্কার অর্থনীতি নিজের পকেটে ভরার জন্য। আজও পৃথিবীতে অনেক আগ্রাসন ও যুদ্ধ হয় ধর্ম বা গণতন্ত্রের নামে, যার পেছনে লুকিয়ে থাকে অর্থনৈতিক স্বার্থ।
  • তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর প্রকৃত ভরসা: আবদুল মুত্তালিবের প্রজ্ঞা আমাদের শেখায় যে, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর (শহর খালি করা) ফলাফলের জন্য সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করতে হয়। যিনি সবকিছুর মালিক, তিনি সঠিক সময়ে ঠিকই রক্ষা করেন।
  • দুর্বলকে দিয়ে শক্তিমানকে পরাজিত করা: আল্লাহ চাইলে ফেরেশতা পাঠিয়ে আবরাহাকে ধ্বংস করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সামান্য ছোট পাখি দিয়ে তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ বাহিনীকে ধ্বংস করে প্রমাণ করেছেন যে, আল্লাহর শক্তির সামনে মানুষের সমস্ত প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র কতটা তুচ্ছ।

আবরাহার এই ঘটনাটি কিয়ামত পর্যন্ত একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে থাকবে যে, বাতিল যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্য এবং ঐশী সুরক্ষার সামনে তা মাকড়সার জালের চেয়েও দুর্বল।

রেফারেন্স: ১. সীরাতে ইবনে হিশাম – আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইবনে হিশাম (রহ.)। ২. তাফসিরে ইবনে কাসির (সূরা ফিলের তাফসির) – হাফেজ ইমাদউদ্দীন ইবনে কাসির (রহ.)। ৩. আর-রাহীকুল মাখতূম – আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহ.)।

আমাদের বইসমূহ

Ha-mim Zubaer

Facebook
Twitter
LinkedIn

Leave a Comment