আবদুল মুত্তালিবের প্রজ্ঞা ও জমজম কূপ খনন : মক্কার রাজনীতিতে কুরাইশদের আধিপত্যের সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস

প্রাচীন মক্কার কাবাঘর, পবিত্র জমজম কূপ খনন এবং আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বের একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক চিত্রপট।

প্রারম্ভিকা: জমজম কূপ খনন

কল্পনা করুন, চারদিকে ধু-ধু মরুভূমি, উত্তপ্ত বালুকারাশি আর রুক্ষ পাহাড়ের সারি। এমন একটি অঞ্চলে পানির মূল্য স্বর্ণের চেয়েও বেশি। এই মরুভূমির প্রাণকেন্দ্র মক্কা নগরী, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী হজ করতে আসেন। কিন্তু তাদের পান করার জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই।

মক্কার চারপাশের ছোটখাটো কুয়াগুলো গ্রীষ্মের খরতাপে শুকিয়ে যেত। এই চরম পানি সংকটের মাঝেই পবিত্র কাবার হাতিমে (হিজর) ঘুমিয়ে ছিলেন মক্কার এক প্রবীণ ও সম্মানিত নেতা। হঠাৎ স্বপ্নে তাকে এক ঐশী নির্দেশ দেওয়া হলো—এমন একটি হারানো গুপ্তধন খনন করার, যা মক্কার ইতিহাস চিরতরে বদলে দেবে।

সেই নেতার নাম আবদুল মুত্তালিব, আর সেই গুপ্তধনের নাম ‘জমজম’।

আজকের এই প্রবন্ধে আমরা নিছক একটি অলৌকিক ঘটনার বাইরে গিয়ে বিশ্লেষণ করব—কীভাবে জমজম কূপের পুনর্জাগরণ আবদুল মুত্তালিবকে অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিল এবং কীভাবে একটি পানির উৎস মক্কার অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় কুরাইশদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

হারানো জমজম: শতকের পর শতক লুকিয়ে থাকা এক রহস্য

জমজম কূপের ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি। হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার নির্জন উপত্যকায় রেখে গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহর হুকুমে জিবরাইল (আ.)-এর পায়ের আঘাতে অথবা ডানার ঝাপটায় এই বরকতময় পানির ধারাটি উৎসারিত হয়েছিল।

কিন্তু কালক্রমে মক্কায় যখন ‘জুরহুম’ গোত্রের লোকেরা বসবাস শুরু করে, তারা একপর্যায়ে অবাধ্যতা ও পাপাচার শুরু করে। ফলস্বরূপ, মক্কার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের সাথে ‘খুজাআ’ গোত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। জুরহুম গোত্র যখন বুঝতে পারে যে তারা পরাজিত হয়ে মক্কা ছাড়তে বাধ্য হবে, তখন তারা অত্যন্ত আক্রোশবশত জমজম কূপের ভেতরে কাবার সমস্ত উপঢৌকন, স্বর্ণের হরিণ এবং তরবারি ফেলে কূপটিকে মাটি দিয়ে পুরোপুরি ভরাট করে দেয়।

তারা এমনভাবে কূপটি ঢেকে দিয়েছিল যেন এর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে। এরপর শত শত বছর কেটে গেছে। মক্কার বুকে অনেক ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু কেউ জমজমের আসল অবস্থানটি আর খুঁজে পায়নি।

পানীয় জলের সংকট ও মক্কার ভূ-রাজনীতি

মরুভূমির ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো ‘পানি’। যার কাছে পানির উৎস থাকে, সেই পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ লাভ করে।

মক্কায় হাজিদের পানি পান করানোকে বলা হতো ‘সিকায়া’ (Siqaya)। এটি ছিল তৎকালীন আরবের সবচেয়ে সম্মানজনক পদ। কিন্তু জমজম কূপ হারিয়ে যাওয়ার পর কুরাইশদের অনেক দূর থেকে পানি বহন করে এনে চৌবাচ্চায় জমা করে হাজিদের পান করাতে হতো। এটি ছিল চরম কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল একটি কাজ।

কুরাইশদের বিভিন্ন শাখার মধ্যে এই সিকায়ার দায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। কে কত বেশি হাজিকে পানি খাওয়াতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করত সেই গোত্রের সামাজিক মর্যাদা। আবদুল মুত্তালিব তখন বনু হাশিম গোত্রের প্রধান। মক্কার এই পানি সংকট তার মনকে সব সময় ভাবিয়ে তুলত।

কাবার চত্বরে ঐশী স্বপ্ন: জমজমের পুনর্জন্মের সূচনা

আবদুল মুত্তালিব প্রায়ই পবিত্র কাবার হাতিমে (হিজর) ঘুমাতেন। একদিন তিনি স্বপ্নে একটি গায়েবি আওয়াজ শুনতে পেলেন।

“স্বপ্নে আমাকে বলা হলো: ‘তাইয়িবাহ’ খনন করো। আমি বললাম, ‘তাইয়িবাহ’ কী? কিন্তু তিনি চলে গেলেন। পরদিন আবার স্বপ্ন দেখলাম, বলা হলো: ‘বাররাহ’ খনন করো। আমি বললাম, ‘বাররাহ’ কী? তিনি চলে গেলেন। তৃতীয় দিন বলা হলো: ‘মাদমুনাহ’ খনন করো। আমি বললাম, ‘মাদমুনাহ’ কী? তিনি চলে গেলেন। চতুর্থ দিন বলা হলো: ‘জমজম’ খনন করো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘জমজম’ কী? তখন আমাকে এর সুনির্দিষ্ট স্থান এবং নিদর্শনগুলো বলে দেওয়া হলো।”

ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক (রহ.) বর্ণনা করেন, স্বপ্নে তাকে বলা হয়েছিল—যেখানে গোবর এবং রক্ত রয়েছে, যেখানে পিঁপড়াদের বাসা আছে এবং যেখানে একটি কাক ঠোকর মারছে, সেখানেই রয়েছে হারানো জমজম।

এই স্বপ্নটি কোনো সাধারণ স্বপ্ন ছিল না। এটি ছিল মক্কার নেতৃত্ব ও অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার এক মহা ইশারা।

একাকী সংগ্রাম এবং গোত্রতান্ত্রিক সমাজের উপহাস

সকাল বেলা আবদুল মুত্তালিব তার একমাত্র পুত্র হারিসকে সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি সত্যিই কাক, পিঁপড়ার বাসা এবং অন্যান্য নিদর্শনগুলো দেখতে পেলেন।

তিনি যখন কোদাল নিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন, তখন কুরাইশ নেতারা ছুটে এল। তারা উপহাস করে বলল, “হে আবদুল মুত্তালিব! তুমি কি আমাদের উপাস্য দেবতা ইসাফ এবং নায়লার মাঝখানে গর্ত খুঁড়তে চাও?”

এখানে একটি সমাজতাত্ত্বিক বিষয় লক্ষণীয়। মক্কার সমাজ ছিল ‘আসাবিয়্যাহ’ বা জনবলনির্ভর গোত্রতান্ত্রিক সমাজ। যার যত বেশি পুত্রসন্তান থাকত, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা তত বেশি বলে বিবেচিত হতো।

সেই মুহূর্তে আবদুল মুত্তালিবের কেবল একজন পুত্র (হারিস) ছিল। কুরাইশদের অন্যান্য নেতারা, যাদের বহু সন্তান ও জনবল ছিল, তারা এই দুর্বলতার সুযোগে আবদুল মুত্তালিবকে বাধা দিতে চাইল। একজন প্রবীণ নেতাকে একা কোদাল হাতে মাটি খুঁড়তে দেখে তারা চরম উপহাস করতে শুরু করল।

এই অসহায়ত্ব আবদুল মুত্তালিবের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছিল। তিনি সেদিন মক্কার সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুর বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন—জনবল ছাড়া এখানে প্রজ্ঞা ও সততার কোনো মূল্য নেই।

একটি কঠিন মানত এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা

কুরাইশদের তীব্র বাধা এবং জনবলের অভাবে আবদুল মুত্তালিব সেদিন কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ঐতিহাসিক মানত (Vow) করেছিলেন।

“তিনি মানত করলেন, যদি আল্লাহ তাকে দশটি পুত্রসন্তান দান করেন এবং তারা বড় হয়ে তাকে কুরাইশদের বাধা থেকে রক্ষা করার মতো শক্তিশালী হয়, তবে তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাবার সামনে কোরবানি করবেন।”

এই মানতটি নিছক আবেগপ্রসূত ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন গোত্রতান্ত্রিক সমাজে টিকে থাকার এক মরিয়া আকাঙ্ক্ষা এবং আল্লাহর ওপর চরম তাওয়াক্কুলের (নির্ভরশীলতা) নিদর্শন।

অবশেষে আবদুল মুত্তালিব যখন আরও গভীরে খুঁড়লেন, তখন তিনি ইসমাইল (আ.)-এর আমলের সেই প্রাচীন কূপের গাঁথুনি এবং জুরহুম গোত্রের ফেলে যাওয়া স্বর্ণের হরিণ ও তরবারিগুলো আবিষ্কার করলেন। আনন্দের আতিশয্যে তিনি চিৎকার করে উঠলেন— “আল্লাহু আকবার!”

জমজমের অধিকার নিয়ে কুরাইশদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

জমজম কূপ এবং গুপ্তধন আবিষ্কৃত হওয়ার সাথে সাথেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেল। যে কুরাইশ নেতারা কিছুক্ষণ আগেও উপহাস করছিল, তারা এবার হিস্যা দাবি করে বসল।

তারা বলল, “হে আবদুল মুত্তালিব! এটি আমাদের আদি পিতা ইসমাইলের কূপ। সুতরাং এতে আমাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। আমাদেরকে এর অংশীদার বানাতে হবে।”

আবদুল মুত্তালিব তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, এই দায়িত্বটি কেবল তাকেই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরাইশরা নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, তারা সিরিয়া (শাম) সীমান্তের এক নারী গণকের কাছে গিয়ে বিচার চাইবে।

মরুভূমির বুকে অলৌকিক বিচার

তারা সবাই মিলে সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা হলো। পথিমধ্যে এক বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে আবদুল মুত্তালিব এবং তার সাথীদের পানি শেষ হয়ে গেল। তারা চরম তৃষ্ণায় মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন।

বিরোধকারী কুরাইশ দল তাদের পানি দিতে অস্বীকার করল। এমন সময় আবদুল মুত্তালিবের উটটি যখন বসা থেকে উঠে দাঁড়াল, তখন উটের পায়ের নিচের মাটি থেকে অলৌকিকভাবে একটি মিষ্টি পানির ঝরনা প্রবাহিত হতে শুরু করল!

এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে বিরোধীরা হতবাক হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল যে, আবদুল মুত্তালিবের ওপর আল্লাহর বিশেষ রহমত রয়েছে। তারা তৎক্ষণাৎ বলল, “আল্লাহর শপথ! যিনি এই মরুভূমিতে আপনাকে পানি পান করিয়েছেন, তিনিই আপনাকে জমজমের অধিকার দিয়েছেন। আমরা আর কখনোই আপনার সাথে জমজম নিয়ে বিবাদ করব না।”

মক্কার নেতৃত্বে আবদুল মুত্তালিবের নিরঙ্কুশ আধিপত্য

মক্কায় ফিরে আসার পর আবদুল মুত্তালিব তার প্রজ্ঞা ও মহানুভবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি কূপ থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণের হরিণ এবং তরবারিগুলো নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করলেন না।

বরং সেই স্বর্ণ গলিয়ে তিনি কাবার দরজা নির্মাণ করলেন এবং কাবার সৌন্দর্যবর্ধনে তা ব্যয় করলেন। এই নিঃস্বার্থ পদক্ষেপটি মক্কার সমাজে তার মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল।

জমজম কূপটি পুনর্খননের ফলে মক্কায় সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান হলো। ‘সিকায়া’ (হাজিদের পানি পান করানো) এবং ‘রিফাদা’ (হাজিদের মেহমানদারি)-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বগুলো স্থায়ীভাবে বনু হাশিমের (আবদুল মুত্তালিবের বংশ) হাতে চলে এল।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বনু হাশিম মক্কার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলো। মূলত, এই জমজম কূপই ছিল সেই ভিত্তি, যা পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বংশধারাকে মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আবদুল্লাহর কোরবানি ও ‘দিয়াত’ বা রক্তপণের বিধান

বছর ঘুরতে লাগল। আল্লাহর রহমতে আবদুল মুত্তালিব দশটি পুত্রসন্তানের পিতা হলেন। তারা সবাই যখন টগবগে যুবক, তখন আবদুল মুত্তালিবের তার সেই পুরোনো মানতের কথা মনে পড়ল।

তিনি তার পুত্রদের কাবার সামনে ডেকে আনলেন এবং মানতের কথা জানালেন। পুত্ররা বিনাবাক্যে পিতার আদেশ মেনে নিল। নিয়ম অনুযায়ী লটারি করা হলো এবং দশটি তীরের মধ্যে নাম উঠল আবদুল মুত্তালিবের সবচেয়ে আদরের এবং কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহর! এই আবদুল্লাহই হলেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পিতা।

আবদুল মুত্তালিব এক হাতে ছুরি এবং অন্য হাতে আদরের সন্তানকে নিয়ে কাবার দিকে এগোতে লাগলেন। পুরো মক্কায় হাহাকার পড়ে গেল। কুরাইশ নেতারা, বিশেষ করে আবদুল্লাহর মামারা (বনু মাখজুম) পথরোধ করে দাঁড়াল। তারা বলল, “আপনি যদি এই কোরবানি করেন, তবে আরবে এটি একটি জঘন্য প্রথায় পরিণত হবে। প্রতিটি পিতা তার সন্তানকে কোরবানি দিতে শুরু করবে।”

অবশেষে এক বিজ্ঞ মহিলার পরামর্শে আবদুল্লাহ এবং দশটি উটের মধ্যে লটারি করা হলো। প্রতিবারই নাম ওঠে আবদুল্লাহর। এভাবে উটের সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে যখন ১০০টি উট করা হলো, তখন উটের নামে লটারি উঠল।

আবদুল মুত্তালিবের নির্দেশে ১০০টি উট কোরবানি করে মক্কার প্রান্তরে ছেড়ে দেওয়া হলো, যাতে মানুষ ও পশু-পাখি স্বাধীনভাবে তা খেতে পারে।

এই ঘটনাটি আরবের সমাজব্যবস্থায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছিল। এখান থেকেই ইসলামি শরীয়তে একজন মানুষের জীবনের বিনিময়ে ‘রক্তপণ’ বা দিয়াত হিসেবে ১০০ উট নির্ধারণের রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাসূল (সা.) পরবর্তীতে ইসলামি আইনে বহাল রেখেছিলেন।

নবীজি (সা.) গর্ব করে বলতেন: “আমি হলাম দুই জবিহুল্লাহ (যাদের কোরবানির জন্য পেশ করা হয়েছিল)-এর সন্তান।” (ইসমাইল আ. এবং পিতা আবদুল্লাহ)।

আমাদের জন্য শিক্ষা (শিক্ষণীয় দিক)

আবদুল মুত্তালিবের জমজম কূপ খননের এই সুদীর্ঘ ইতিহাস কেবল প্রাচীন আরবের কোনো উপকথা নয়। বর্তমান যুগে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের জন্য এতে রয়েছে গভীর শিক্ষণীয় বিষয়:

  • জনস্বার্থে সম্পদের ব্যবহার (জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতি): আবদুল মুত্তালিব কূপ থেকে প্রাপ্ত গুপ্তধন নিজের বিলাসবহুল জীবনের জন্য ব্যয় করেননি, বরং তা কাবার কল্যাণে ওয়াকফ করেছিলেন। আধুনিক যুগের নেতাদের জন্য এটি এক বিশাল শিক্ষা যে, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সম্পদ কখনোই ব্যক্তিগত পকেট ভারী করার জন্য নয়।
  • প্রতিকূলতায় অবিচল থাকা (দৃঢ়তা): যখন পুরো সমাজ এবং এলিট শ্রেণি তার বিরুদ্ধে উপহাস করছিল, তখন তিনি ভেঙে পড়েননি। একা হলেও সত্যের পথে অটল থাকা এবং অবিচল মানসিকতা (দৃঢ়তা) একজন সফল নেতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
  • তাওয়াক্কুল এবং প্রতিজ্ঞার মূল্যায়ন: চরম বিপদের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি মানত করেছিলেন এবং তা পূরণে তিনি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। যদিও শরীয়ত পরবর্তীতে মানুষ কোরবানি রহিত করেছে, কিন্তু ওয়াদা পালনের এই দৃঢ়তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়।
  • সম্পদ ও নেতৃত্বের যোগসূত্র: সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, সম্পদের (যেমন- পানি) সুষম ব্যবস্থাপনা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে এর ব্যবহারই একটি গোত্র বা জাতিকে নেতৃত্বের আসনে বসায়। বনু হাশিম মক্কার লিডারশিপ পেয়েছিল তাদের সেবামূলক মনোভাবের (সিকায়া ও রিফাদা) কারণেই।

মরুভূমির ধূসর বালুর নিচে হারিয়ে যাওয়া সেই জমজম কূপ আজো কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করে চলেছে। আর আবদুল মুত্তালিবের সেই প্রজ্ঞা ও একনিষ্ঠতা প্রমাণ করে যে, সত্যনিষ্ঠ লক্ষ্য এবং স্রষ্টার ওপর অগাধ বিশ্বাস থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে দমাতে পারে না।

রেফারেন্স: ১. সীরাতে ইবনে হিশাম – আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইবনে হিশাম (রহ.)। ২. আর-রাহীকুল মাখতূম – আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহ.)। ৩. তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক (তারীখে তাবারী) – ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.)। ৪. সীরাতুল মুস্তফা (সা.) – আল্লামা ইদ্রিস কান্ধলভি (রহ.)।

আমাদের বইসমূহ

Ha-mim Zubaer

Facebook
Twitter
LinkedIn

Leave a Comment